দেশ প্রথম পাতা

একবিংশ শতাব্দীতেও ‘গাউকোর’ প্রথায় মরছে নারী! মেয়েরা কি অপবিত্র?

নিজস্ব প্রতিনিধি : ‘শিব ঠাকুরের আপন দেশে নিয়মকানুন সর্বনেশে’ আর মেয়েদের ক্ষেত্রে তো সেই সব সর্বনেশে নিয়মের মা-বাপ কোনো কালেই ছিল না!! ‘মেয়েরা মায়ের জাত’ বা ‘মেয়েদের প্রাণ কই মাছের জান’ কিংবা ‘মেয়ে মানেই সর্বংসহা’—এই রকম সব চলতি মানসিকতার কবলে দরিদ্র বিশ্বের মেয়েদের শরীরে পুষ্টির ঘাটতি রয়ে যায় ! সেই সময় নাকি তিন দিন শ্যাম্পু করা যাবে না, মন্দিরে যাওয়া যাবে না, বিভিন্ন খাবার স্পর্শ করা যাবে না ইত্যাদি নানা বেড়াজাল, নানা ট্যাবু।

ধুম জ্বর বছর চুয়াল্লিশের জয়ন্তী গাওয়াড়ের। তার মধ্যে শুরু হল মাসিক ঋতুস্রাব। শরীরটা একদম ভাল ছিল না। আর এত কিছু অসুভিদার মধ্যে জয়ন্তীকে যেতে হল গ্রামের প্রান্তে জঙ্গলের ধারে জীর্ণ ‘গাউকোর’ বা ঋতুকালীন ঘরে।

এটাই গোন্ড ও মারিয়া উপজাতির রীতি। ‘গাউকোর’ না মানলে সমাজচ্যুত হতে হবে মহিলার পরিবারকে। ঋতুকালীন চলার প্রথম চার দিন নারীকে ‘অপবিত্র’ মনে করেন এই ধরনের উপজাতির মানুষ। এই সময়ে কোনও মহিলার গ্রামে বা গ্রামের পুকুরও ব্যবহার করতে পারবেন না। এমন কিতাঁর সঙ্গে কথাও বলবেন না কেউ। ঠাঁই হবে গ্রাম থেকে দূরে গাউকোরে। সে সব ঘর প্রায় ভগ্নস্তূপ। জানলাহীন, দরজার কপাট নেই। গাছের পাতা, ছেঁড়া কাপড় দিয়ে কোনও রকমে আড়াল করা জায়গায় মলমূত্র ত্যাগ করতে হয়।

২০১৭ সালের ১৫ নভেম্বর মহারাষ্ট্রের গড়ছিরৌলি জেলার এটাপল্লিটোলা গ্রামে এই রকমই এক গাউকোরে পড়ে ছিল জয়ন্তীর দেহ। জ্বরে রক্তচাপ বেড়ে মস্তিষ্কের ধমনী ফেটে গিয়েছিল তাঁর। যখন অসুস্থ বোধ করছিলেন, ধারেকাছে কেউ ছিল না। এরও বছর খানেক আগে ঘোর বর্ষার মধ্যে মহারাষ্ট্রের ভমরাগড় জেলায় গাউকোরে ছিল বছর তেরোর এক কিশোরী। প্রবল রক্তপাত হচ্ছিল তার। নিস্তেজ হতে-হতে ক্রমে থেমে যায় হৃদ্‌স্পন্দন।

২০১১ সালে মহারাষ্ট্রের উপজাতি-অধ্যুষিত গড়ছিরৌলি জেলার ২২৩টি গাউকোরের অবস্থা ঘুরে দেখে একটি রিপোর্ট তৈরি করে স্থানীয় একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন। ২০১১ থেকে ২০১৩-র মধ্যে ওই জেলায় তারা বিভিন্ন গাউকোরে ১৫ জন বিভিন্ন বয়সের নারীর মৃত্যুর তথ্য সংগ্রহ করেছিল।

অভিযোগ, এ নিয়ে প্রশাসনও চুপ।গড়ছিরৌলির যে স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা প্রথম গাউকোরের দুরবস্থা নিয়ে মুখ খোলে তার প্রধান দিলীপ বর্ষাগাডের কথায়, ”এতে মহিলাদের স্বাস্থ্য ও প্রজনন ক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাঁদের ‘অপবিত্র’ তকমা দিয়ে একঘরে করে দিয়ে চূড়ান্ত অপমান করা হয়। অথচ সরকার তা নিয়ে চুপ।”

কেন্দ্রীয় মানবাধিকার কমিশনের এক সদস্যের কথায়, ”মোট ৬ বার মহারাষ্ট্র সরকারকে এই প্রথা বন্ধে ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অথচ উপজাতি মহিলাদের মর্যাদাহানিকর গাউকোর এখনও রয়ে গিয়েছে। কমিশনের ফৌজদারি ক্ষমতা নেই বলে প্রশাসন কথা শোনার প্রয়োজনীয়তা বোধ করে না।” তালুকের গিরোলা গ্রামের মারিয়া জনজাতির মেয়ে সানঝি কোরচে এখন দ্বাদশ শ্রেণিতে পড়াশোনা করছে। টেলিফোনে বলল, ”যখন প্রতি মাসে গ্রাম থেকে বেরিয়ে জঙ্গলে গাউকোরে ঢুকতে হয় তখন মনে হয় এত কষ্ট করে লেখাপড়া শেখা বৃথা। এতটুকু এগোয়নি আমার সমাজ।” সীতাটোলার বছর চব্বিশের সতীশীলা হরিদাস টেলিফোনে বলেন, ”দশ-এগারো বছরের ছোট্ট মেয়েগুলোকে একা ঋতুর সময়ে গাউকোরে রেখে আসতে হয়। ভয়ে আধমরা হয়ে থাকে।”

ঋতুকালীন সময়ে মহিলারা ‘অপবিত্র’— এই ধারণা থেকেই কেরলের শবরীমালা মন্দিরে নির্দিষ্ট বয়সের মেয়েদের প্রবেশ নিষিদ্ধ ছিল। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশের পরেও নারীর কাছে সেই মন্দিরের পথ সুগম হয়নি। ভারতে ঋতুকালীন সময়ে অযৌক্তিক নানা নিয়মকে কেন্দ্র করে তৈরি তথ্যচিত্র ‘পিরিয়ড. এন্ড অব সেনটেন্স’ সম্প্রতি অস্কার পেয়েছে। তার পরেও প্রান্তবাসী জনজাতির মেয়েদের মাসের এই কয়েকটা দিনে আরও প্রান্তবাসী করে দেওয়ার ঐতিহ্য অটুট।

Image may contain: outdoor

শুধু দেশে না দেশের বাইরেও এই রকম কুপ্রথা আছে। পশ্চিম নেপালের বিভিন্ন প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে বসতি অঞ্চলের বাইরে নিরিবিলি জনমানবশূন্য স্থানে খড়ের ছাউনি দেওয়া কাঠের দরমার খুপরি-খুপরি কুঁড়ে ঘর করা থাকে। যাকে নেপালি ভাষায় ‘ছাওপড়ি’ বলা হয়। গ্রামের মেয়েদের নিজেদের ঋতুচক্র চলাকালীন ঠাঁই হয় এখানে। কোথাও কোথাও আবার পাহাড়ের মাঝখানে নির্জন স্থানে পরিত্যক্ত গোয়ালঘর ‘ছাওপড়ি’ হিসাবে ব্যবহৃত হয়ে থাকে।

 

 

Spread the love

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।