জেলা প্রথম পাতা রাজনৈতিক

ত্রাণ বন্টনকে কেন্দ্র করে কামারহাটিতে প্রকাশ্যে তৃণমূলের গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব, রণক্ষেত্র গোটা এলাকা, আটক ৭।

নিজস্ব সংবাদদাতা, বারাকপুর, ৫মে:- ত্রাণ বন্টনকে কেন্দ্র করে মঙ্গলবার রণক্ষেত্রের চেহারা নিল বারাকপুর শিল্পাঞ্চলের কামারহাটি। গোটা ঘটনায় রক্তাক্ত হয়েছে এক পুলিশ কর্মী। ভাঙচুর করা হয়েছে স্থানীয় পুরপ্রতিনিধির বাড়ি সহ দলীয় দফতর। ঘটনায় বেলঘড়িয়া থানার পুলিশ সাত জনকে আটক করেছে। উত্তেজিত জনতাকে নিয়ন্ত্রণে আনতে টিয়ার গ্যাসের সেলেও ফাঁটায় পুলিশ। যদিও টিয়ার গ্যাসের সেলেও ফাঁটানোর কথা অস্বীকার করেছে পুলিশ।
মঙ্গলবার সকালে শাসক দলের দুই গোষ্ঠীর মধ্যে ত্রাণ বিলিকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ বাঁধে কামারহাটি পুরসভার ২৯ নম্বর ওয়ার্ডে। সংঘর্ষে কাউন্সিলরের বাড়ি ভাঙচুর চালায় উত্তেজিত জনতা। পুলিশকে লক্ষ্য ইঁট বৃষ্টি করা হয়। পাল্টা পুলিশ উত্তেজিত জনতাকে নিয়ন্ত্রণে আনতে লাঠিচার্জ করে। স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, লকডাউনের সময় থেকেই কাউন্সিলর ও তার বিরোধী গোষ্ঠীর মধ্যে ত্রাণ বিলিকে কেন্দ্র করে ঠান্ডা লড়াই চলছিল। এরইমধ্যে সোশ্যাল মিডিয়া ত্রাণ বিলির ছবি পোস্ট করা নিয়ে কাউন্সিলর ও তার বিরোধী গোষ্ঠীর এক যুবকের সাথে বচসা বাঁধে। সেখান থেকেই গোটা ঘটনার সূত্রপাত ঘটে। অভিযোগ, ওই ওয়ার্ডের মধ্যপল্লীর বাসিন্দা তৃণমূল কর্মী বছর পঁচিশের যুবক সৌমেন দাস ও তার সঙ্গী সাথী মিলে লকডাউনের শুরু থেকে এলাকায় ত্রাণ বিলির কাজ করছিল। সে সময় কাউন্সিলর নিষ্ক্রিয় ছিল। এরপরে কাউন্সিলরও সক্রিয় হয়ে ওঠে এবং ত্রাণ বিলি শুরু করে। সেই ছবি তিনি সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টও করেন। এ নিয়ে সৌমেন দাস নামে ওই যুবক প্রতিবাদ জানায়। রবিবার এই নিয়ে দু’পক্ষের মধ্যে বচসাও বাঁধে। সেই বচসা চলাকালীনই কাউন্সিলর ও তার ছয় সাত জন সঙ্গী মিলে বাঁশ, লাঠি, রড দিয়ে ব্যাপক মারধর করে ওই যুবককে। যাতে গুরুতর আহত হয় ওই যুবক। এমনকি সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়ে বলে অভিযোগ। এরপরেই ওই যুবককে প্রথমে কামারহাটির সাগর দত্ত হাসপাতাল সেখান থেকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় আর জি কর ও পরে কলকাতার পিজি হাসপাতালে স্থানান্তরিত করা হয় অত্যন্ত সঙ্কটজনক অবস্থায়। এরই মধ্যে এ দিন এলাকায় খবর রটে যায় ওই যুবক মারা গিয়েছেন। এই খবর রটতেই এলাকাবাসী উত্তেজিত হয়ে পড়ে। এরপরেই উত্তেজিত জনতা ভাঙচুর চালায় ওই তৃণমূল কাউন্সিলরের বাড়িতে। বাসুদেবপুরে কাউন্সিলরের বাড়ির জানালার কাঁচ থেকে শুরু করে আসবাব পত্র সমস্ত কিছু তছনছ করে দেয় উত্তেজিত জনতা। কাউন্সিলরের বাড়িতে হামলা হয়েছে খবর পেয়ে বেলঘড়িয়া থানার পুলিশ পৌঁছায়। পুলিশকে দেখেই জনতা আরও উত্তেজিত হয়ে পড়ে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ কাউন্সিলরের বাড়িতে প্রবেশ করে হামলাকারীদের বেড়ে করে আনে। এবং লাঠিচার্জ করে। এতেই আগুনে ঘি পড়ে। উত্তেজিত জনতা আরও ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে পুলিশকে লক্ষ্য করে ইঁট বৃষ্টি শুরু করে। যাতে এক এএসআই পদমর্যাদার পুলিশ কর্মীর মাথা ফেঁটে যায়। এরপরেই পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছায় বিশাল পুলিশবাহিনী ও র‍্যাফ। ঘটনাস্থলে পৌঁছায় বারাকপুর কমিশনারেটের ডেপুটি কমিশনার দক্ষিণ আনন্দ রায়। এরপরেই গোটা এলাকা টহল দিতে শুরু করে পুলিশ। এতেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে। যদিও এলাকা এখনও থমথমে। এলাকায় বসেছে পুলিশ পিকেট। অভিযোগ, ডেপুটি কমিশনার আসার আগে এক রাউণ্ড টিয়ার গ্যাস চলে যদিও অভিযোগ অস্বীকার করে পুলিশ জানায়, গোটা ঘটনায় সাত জনকে আটক করা হয়েছে। এক পুলিশ কর্মী আহত হয়েছেন।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, একটা নিরীহ ছেলে এই সময় গরিবদের পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। কিন্তু কাউন্সিলর প্রশ্ন তোলেন তিনি থাকতে কেন অন্য কেউ ত্রাণ দেবে? এই নিয়ে দুইপক্ষের মধ্যে শুরু হয় বচসা। এরপরই সৌমেন দাস নামে ওই যুবককে কাউন্সিলর ও তার অনুগামী সৈকত দত্ত, কার্তিক দত্ত, অভয় তেওয়ারি সহ সাত জন মিলে ব্যাপক মারধর করে। আহত সৌমেনের মা অনু দাসের দাবি, ছেলে ত্রাণ বিলি করছিল বলেই রেগে যান ওই মহিলা কাউন্সিলর। তাঁর দলবল রড, লাঠি, বাঁশ, ইট দিয়ে মেরেছে ছেলেকে। এমনকি কাউন্সিলর রূপালি সরকারও ছেলের চুলের মুঠি ধরে মারধোর করেছে বলে অভিযোগ করেছেন তিনি। তিনি ওই কাউন্সিলরের শাস্তি ও পদত্যাগের দাবি করেন। সৌমেনের কাকিমা লক্ষ্মী দাস জানান, অত্যন্ত সঙ্কটজনক অবস্থায় সৌমেন এসএসকেএম (পিজি) হাসপাতালে ভর্তি রয়েছে। তার দাবি, সামান্য ত্রাণ বিলিকে কেন্দ্র করে কাউন্সিলর ও তার অনুগামীরা সৌমেনের ওপর হামলা চালায়। যদিও সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করে কাউন্সিলর রূপালি সরকার জানান, এই ঘটনা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক। ত্রাণ বিলি নিয়ে কেন গোলমাল বাঁধল সেটা দেখা হবে। তবে তিনি মারধরের সঙ্গে যুক্ত নন। তার পাল্টা অভিযোগ, কয়েকজন দুষ্কৃতী মধ্যরাতে তার বাড়ি লক্ষ্য করে বোমাবাজি করে। এদিকে, এই ঘটনায় পুলিশের ভূমিকা নিয়ে শুরু হয়েছে রাজনৈতিক তরজা। কামারহাটির সিপিএম বিধায়ক মানস মুখার্জি পুলিশের সমালোচনা করে বলেন, পুলিশকর্মীর আহত হওয়াই উচিৎ। আজকে আহত হয়েছে। পরের দিন আরও বেশি আহত হবে যদি পুলিশ কাজ না করে। বিজেপির পক্ষে রাজু ব্যানার্জি জানান, পুলিশ যদি কাউন্সিলরের দালালি করে তাহলে জনগণ আইন হাতে তুলে নেবে। এই ঘটনাই তার প্রমান। যদিও কামারহাটি পুরসভার তৃণমূল পুরপ্রধান গোপাল সাহা পুলিশের ভূমিকার প্রশংসা করে বলেন, পুলিশ সদর্থক ভূমিকা পালন করছে। বারাকপুর কমিশনারেটের ডেপুটি কমিশনার দক্ষিণ আনন্দ রায় বলেন, গোটা ঘটনার তদন্ত শুরু হয়েছে।

Spread the love