আন্তর্জাতিক প্রথম পাতা রাজনৈতিক

লাদাখ সীমান্তে তিন ভারতীয় ও পাঁচ চিনা সেনার মৃত্যু।

লাদাখের বাতাসে ফের বারুদের গন্ধ। ৪৫ বছর পরে চিনা হামলায় ভারতীয় সেনার মৃত্যুর ঘটনা ঘটল লাদাখের প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ রেখায়। গত বেশ কিছুদিন ধরেই উত্তেজনার পারদ চড়ছিল দু দেশের সেনাদের মধ্যে। এদিন হঠাৎই তা রক্তক্ষয়ী হয়ে উঠল। সোমবার রাতে গলওয়ান উপত্যকায় হামলা চালাতে এসে ভারতীয় বাহিনীর প্রত্যাঘাতে খতম হয়েছে পাঁচ চিন সেনা। হামলায় ভারতীয় সেনার এক কর্নেল এবং দুই জওয়ান শহিদ হয়েছেন।
শান্তিরক্ষার বার্তা মেনে ধীরে ধীরে পিছিয়ে আসছিল ভারতীয় সেনা। কিন্তু সেই সময়েই হঠাত্ আঘাত হানে চিন। তবে, আত্মরক্ষার্থে পাল্টা প্রত্যুত্তর দিয়েছে ভারতীয় সেনাও। ভারতীয় সেনার পাল্টা জবাবে চিনের সেনার ৫ জন জওয়ান প্রাণ হারিয়েছেন। আহত হয়েছেন প্রায় ১১ জন।
চিনা সংবাদমাধ্যম গ্লোবাল টাইমসের সম্পাদকও নিজে টুইটে গালোয়ান উপত্যকায় ভারতীয় সেনার পাল্টা গুলিতে চিনের সেনার মৃত্যুর কথা জানিয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি লেখেন, “আমি ভারতীয় পক্ষকে বলছি, অহঙ্কার দেখিয়ে চিনের সহ্যক্ষমতাকে দূর্বলতা ভেবে নেওয়ার কোনও কারণ নেই।” সেই সঙ্গে তিনি লেখেন, “চিন ভারতের সঙ্গে কোনও সংঘর্ষ চায় না, তবে আমরা সেটা ভয় পাই না।”
প্রসঙ্গত, গত সপ্তাহেই দিল্লি ও বেজিংয়ের সেনা আধিকারিকদের উচ্চ পর্যায়ের আলোচনা হয়। সেখানেই নিঃশর্তভাবে দুই দেশের সেনার তরফে লাদাখ সীমান্তে শান্তি বজায় রাখার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। একই সঙ্গে ঠিক হয়, সীমান্ত থেকে সেনা পিছিয়ে আনবে দুই দেশই। কিন্তু সোমবার রাতে উল্টে ভারতীয় সেনার উপর অতর্কিতে হামলা চালায় চিন।
এ দিকে, বেজিঙের অভিযোগ, সীমান্ত পার করে চিনাদের উপর হামলা চালিয়েছে ভারতীয় সেনা। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে দু দেশের শীর্ষ সেনা আধিকারিকরা বৈঠক করছেন। গোটা পরিস্থিতি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে জানালেন প্রতিরক্ষা মন্ত্রী রাজনাথ সিং ও জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভাল।
ভারত সরকার এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, ‘গতকাল রাতে গালওয়ান উপত্যকায় দ্বন্দ্ব কাটিয়ে ডি-এসকেলেশনের সময়ই হিংসাত্মক সম্মুখসমর বাঁধে। তাতে দু পক্ষই হতাহত হয়েছে। ভারতীয় বাহিনীর এক অফিসার ও দুই জওয়ানের মৃত্যু হয়েছে। বর্তমানে সেনাবাহিনীর শীর্ষ আধিকারিকরা উত্তেজনা প্রশমনে বৈঠক করছেন।’
সেনা সূত্রে দাবি করা হয়েছে, কোনও গুলি চলেনি। খালি হাতে লড়াই করেই প্রাণ গিয়েছে ভারতীয় অফিসার ও জওয়ানদের। এ দিকে বেজিঙের অভিযোগ, সীমান্ত পার করে ভারতীয় সেনা চিনের মানুষের উপর হামলা চালিয়েছে।
৫-৬ মে লাদাখ সীমান্তের কাছে প্যানগং সোতে টহলদারির সময় হাতাহাতিতে জড়িয়ে পড়ে দু’দেশের সেনা। তারপর থেকেই লাদাখ সীমান্তে সেনা বাড়াচ্ছে দু’পক্ষই, বাড়ছে উত্তেজনা। একের পর এক বৈঠকেও সীমান্তের উত্তেজনা কমার কোনও লক্ষণ দেখা যায়নি। শুক্রবার পূর্ব লাদাখ সীমান্তে ভারতীয় সেনার প্রস্তুতি এবং সিকিম, উত্তরাখণ্ড ও অরুণাচল প্রদেশের প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখার পরিস্থিতি খতিয়ে দেখেন প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং। উচ্চ পর্যায়ের বৈঠকে তাঁকে বিস্তারিত তথ্য জানান সেনাপ্রধান নারাভানে, ছিলেন চিফ অফ ডিফেন্স স্টাফ জেনারেল বিপিন রাওয়াতও।
গতকালই দু’পক্ষের ব্রিগেডিয়ার পর্যায়ের বৈঠক শুরু হয়েছিল। তার পরেই চিনের হামলা। ভারতীয় সেনার পক্ষ থেকে মঙ্গলবার দুপুরে এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘‘পূর্ব লাদাখে প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ রেখায় (এলএসি) উত্তেজনা কমানোর চেষ্টা চলাকালীনই গতকাল রাতে সংঘর্ষ বাধে। তাতে ভারতীয় সেনার এক অফিসার এবং দুই জওয়ানের মৃত্যু হয়েছে। দু’পক্ষের উচ্চপর্যায়ের অফিসারেরা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বৈঠক করছেন।’’ চিনের সেনা আধিকারিকদের সঙ্গে বৈঠকে রয়েছেন ৩ নম্বর পদাতিক ডিভিশনের প্রধান, মেজর জেনারেল অভিজিৎ বাপত। তবে শান্তিপ্রক্রিয়া চলাকালীন ঠিক কী কারণে রাতের অন্ধকারে দু’পক্ষের সংঘর্ষ শুরু হল, তা নিয়ে কিছু বলা হয়নি সেনা বা প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের তরফে।
প্রসঙ্গত, মে মাসের গোড়াতেই পূর্ব লাদাখের গলওয়ান উপত্যকা, নাকু লা এবং প্যাগং লেকের উত্তরপ্রান্তে এলএসি পেরিয়ে ভারতীয় এলাকায় কয়েক কিলোমিটার অনুপ্রবেশ করে চিনা ফৌজ। তারা রীতিমতো তাঁবু খাটিয়ে ঘাঁটি গেড়ে বসে। খবর পেয়ে মুখোমুখি মোতায়েন হয় ভারতীয় সেনা। তার পর থেকে দফায় দফায় সেনাস্তরের বৈঠকেও জট কাটেনি। বেশ কয়েকবার দু’তরফের হাতাহাতি এবং জখম হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। সেনা সূত্রের খবর, ৬ জুনের বৈঠকের পরে নাকু লায় দু’পক্ষ কিছুটা পিছিয়ে আসে। পিপি-১৫ এবং হট স্প্রিং এলাকাতেও চিন সেনা কিছুটা পিছু হটে যায়। অন্য এলাকাগুলিতে এখনও উত্তেজনা রয়েছে।
লেহ্ থেকে দৌলত বেগ ওল্ডি বায়ুসেনা ঘাঁটির উত্তর অংশ পর্যন্ত ভারতের নয়া রাস্তা তৈরি ঘিরেই সাম্প্রতিক টানাপোড়েনের সূচনা বলে প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের ধারণা। এলএসি ঘেঁষা ওই রাস্তা দারফুক, শিয়ক ছুঁয়ে চিন নির্মিত কারাকোরাম পাসের কাছে শেষ হয়েছে। দুর্গম ওই এলাকায় ভারতীয় ফৌজের যাতায়াতের পথ সুগম হয়ে যাওয়ায় রক্তচাপ বেড়েছে লাল ড্রাগনের।

Spread the love