জেলা প্রথম পাতা রাজনৈতিক

কাটমানির ভুয়ো অভিযোগে হেনস্থা করতে চাইলে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে দলীয় নেতাদের নির্দেশ মমতার

বিষ্ণুপুরকে নতুন সাংগঠনিক জেলা হিসেবে ঘোষণা তৃণমূলের

দেবাশিস দাস

কটমানি ইস্যু নিয়ে ফের মুখ খুললেন তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। শুক্রবার তৃণমূল ভবনে ঝাড়গ্রাম ও বাঁকুড়া জেলার সাংগঠনিক বৈঠকে তৃণমূল সুপ্রিমো সাফ জানিয়ে দেন, ভাবমূর্তি নষ্ট করার জন্য কেউ যদি জেনেবুঝে বেকায়দায় ফেলার চেষ্টা করে তাহলে পাল্টা প্রতিরোধ করুন। সম্প্রতি জঙ্গলমহলের দু-একটি জায়গায় শাসকদলের নেতাদের একাংশের ভাবমূর্তি নষ্ট করতে অযথা কোনও তথ্য ছাড়াই কাটমানি ইস্যুকে সামনে রেখে পেছন থেকে বিজেপি’র মদতে দলীয় নেতাদের বিব্রত করার চেষ্টা হচ্ছে— এই খবর তৃণমূল সুপ্রিমোর কাছে এসেছে। ফলে আগামীতে কোনও তথ্য ছাড়াই শাসকদলের নেতাদের কাছ থেকে চক্রান্ত করে কাটমানি ফেরত চাইতে এলে তার প্রতিরোধে দলীয় নেতাদের রাস্তায় নামার নির্দেশ দিলেন তৃণমূল সুপ্রিমো। শুধু এখানেই থেমে থাকেননি তৃণমূল সুপ্রিমো, এই প্রসঙ্গে মমতা এদিন সাফ জানান, কাটমানি নিয়ে এভাবে বলিনি, যেভাবে বিজেপি বিকৃত করছে এটাকে। এদিন দলীয় বৈঠকে ঝাড়গ্রামের দহিজুড়ির এক স্থানীয় নেতা কাটমানি ইস্যুকে সামনে রেখে কিভাবে স্বচ্ছ ভাবমূর্তি নেতাদেরও এই পঙক্তিতে ফেলার চক্রান্ত চলছে তা বিশদে তৃণমূল সুপ্রিমোর কাছে তুলে ধরেন। এরপরেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দলীয় বৈঠকে এই মন্তব্য করেছেন বলে জানা গিয়েছে।

কাকে ভয় পাচ্ছেন? কিসের ভয়? আপনারা কি আন্দোলন করতে ভুলে গিয়েছেন? বাড়ি বাড়ি যান। আন্দোলনের মাধ্যমেই তো তৃণমূল কংগ্রেসের জন্ম। ফলাফল বেশ কিছু জায়গায় খারাপ হয়েছে ঠিকই, কিন্তু এর জন্য মনোবল হারাবেন না। ২০২১-এ আমরাই ঘুরে দাঁড়াব। জয় আমাদের হবেই। ঠিক এই শব্দবন্ধগুলিকে ” সামনে রেখে ঝাড়গ্রাম ও বাঁকুড়া জেলার দলীয় নেতাদের মানসিকভাবে চাঙ্গা করার চেষ্টা করেন তৃণমূল সুপ্রিমো। অল্পের জন্য ঝাড়গ্রাম লোকসভা কেন্দ্র হাতছাড়া হয়েছে তৃণমূলের। বড় ব্যবধানে হারতে হয়েছে বাঁকুড়া লোকসভা কেন্দ্রতে। কিন্তু এই হারের জন্য বিভিন্ন ঘটনাপ্রবাহ দায়ী হলেও তার থেকে শিক্ষা নিয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য মানসিক শক্তিটা অটুট রাখার কথা স্মরণ করিয়ে দিলেন তৃণমূল সুপ্রিমো। এই প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, একবার হেরেছি মানে এই নয়, দশবার জিতব না। ঠিক এইভাবেই সামনে থেকে নেতৃত্ব দিতে ভালোবাসেন তৃণমূল সুপ্রিমো। এদিন তার অন্যথা হয় নি। যদিও জঙ্গলমহলের জেলাগুলির পর্যবেক্ষক শুভন্দু অধিকারী বলেন, আপনি অনেক করেছে। উন্নয়নে কোনও ঘাটতি ছিল না। ছিল না দলের ঘাটতিও। যারা এখানে বৈঠকে বসে আছে তাদের মধ্যেই ঘাটতি ছিল। আপনাকে কথা দিচ্ছি সবাইকে সাথে নিয়ে ২০২১-এ ফের জঙ্গলমহলে ঘুরে দাঁড়াবে তৃণমূল। উল্লেখ্য, লোকসভা নির্বাচনে জঙ্গলমহলের একটিও কেন্দ্রে তখন জিততে পারেনি। ২০১১ সালে ঠিক ছিল এর উল্টো ছবি।

মাত্র কয়েক হাজার ভোটের ব্যবধানে ঝাড়গ্রাম লোকসভা কেন্দ্রে হারতে হয়েছে তৃণমূলকে। যদিও বাঁকুড়া লোকসভা কেন্দ্রের ফলাফল যথেষ্টই খারাপ। সুব্রত মুখোপাধ্যায়ের মতো হেভিওয়েট নেতাকে প্রার্থী করেও মুখরক্ষা হয়নি বাঁকুড়ায় তৃণমূলের। এদিন তৃণমূল সুপ্রিমো বলেন, ঝাড়গ্রামে একশ্রেণির নেতাদের জনবিচ্ছিন্নতার জন্যই তৃণমূলকে হারতে হয়েছে। জঙ্গলমহলে অনেক উন্নয়ন হয়েছে, কিন্তু সাধারণ তফসিলি জাতি ও উপজাতির মানুষের কাছে যেভাবে পৌঁছানো প্রয়োজন ছিল তা হয়ে ওঠেনি। এমনই অভিযোগ এসেছে বহু ক্ষেত্রে। কিন্তু, মনোবল হারানোর দরকার নেই। ঝাড়গ্রাম শুধু নয়, গোটা জঙ্গলমলে আমরা ঘুরে দাঁড়াব। তবে, যারা বিজেপির হয়ে কাজ করেছে তাদের থেকে দূরত্ব বজায় রাখুন।

এদিন বাঁকুড়া জেলার সাংগঠনিক অবস্থা শক্তিশালী করতে তৃণমূল সুপ্রিমো অনেক সময় ব্যয় করেন এই জেলা নিয়ে। বিষ্ণুপুর স্বতন্ত্রভাবে সাংগঠনিক জেলা হিসেবে কাজ করবে। আগেই শ্যামল সাঁতরাকে এই জেলার সভাপতি করা হয়েছে। এবার ছাত্র, মহিলা ও যুব সংগঠনের দায়িত্ব কাদের কাদের দেওয়া হবে তা খুব শীঘ্রই ঠিক হয়ে যাবে। সংগঠনকে তৃণমূল স্তর পর্যন্ত চাঙ্গা করতে বাঁকুড়া জেলার মধ্যে থাকা বিষ্ণুপুরকে আলাদা সাংগঠনিক জেলা হিসেবে চিহ্নিত করে শাসকদল সংগঠন শক্তপোক্ত করতে চায়। একটি জেলাকে দু’ভাগ করা হল সংগঠনকে মজবুত করার জন্য, যা তৃণমূলের ইতিহাসে প্রথম। এদিন বাঁকুড়া জেলার সংগঠনের বিষয়ে বলতে গিয়ে মমতা সাফ জানিয়ে দেন, যারা বিজেপি’তে চলে গিয়েছে তাদের ফিরিয়ে আনার কোনও দরকার নেই। আমি নিখুঁত লোক নিয়ে সংগঠনের কাজ করতে চাই। বাঁকুড়া জেলার শীর্ষ নেতাদের একাংশের জনবিচ্ছিন্নতাকে এদিন ফের কাঠগড়ায় তুলেছেন মমতা। বলেছেন, অরূপ চক্রবর্তী, অরূপ খাঁ ‘টোটাল ফেলিওর’, ভোগাস। সেই কারণেই অরূপ খাকে সরিয়ে শুভাশিস বটব্যালকে জেলা সভাপতি করা হয়েছে। বিষ্ণুপুরের জেলা, সভাপতি করা হয়েছে শ্যামল সাঁতরাকে। উল্লেখ্য, ওন্দা বিধানসভা অরূপ খাঁ র এলাকার মধ্যে পড়ে। এর ৬টি গ্রামপঞ্চায়েতে বিজেপির জয়জয়কার। বাঁকুড়ার জেলা যুব সভাপতি রাজীব ঘোষালকেও তার পদ থেকে সরিয়ে। দেওয়ার নির্দেশ দেন মমতা। অন্য কাউকে দায়িত্ব দেওয়ার জন্য বলা হয়েছে। বাঁকুড়ার মহিলা সভানেত্রী মৌ সেনগুপ্তকে তার পদে রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।বাঁকুড়া পুরসভার উন্নয়নে গতি আনতে এলাকার বিধায়ক শম্পা দুরিপাকে গুরুত্ব দিয়ে কাজ করার কথা বলা হয়েছে। প্রাক্তন মন্ত্রী শ্যাম মুখার্জিকেও এই জেলার পর্যবেক্ষক শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে যোগাযোগ রেখে কাজ করার কথা বলেন মমতা। জনসংযোগ বৃদ্ধি, নতুন করে মানুষের পাশে যাওয়া, তাদের সুখ-দুঃখের কথা শোনা, যাদের জন্য এত উন্নয়ন তাদেরকে কনফিডেন্সে রেখে কাজ করার জন্য বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। দলীয় নেতাদের পুলিশ প্রশাসনের ওপর নির্ভর না করে রাজনৈতিক কর্মসূচি আরও বেশি করে করার কথা বলেছেন মমতা। এদিন শুভাশিস বটব্যাল বাঁকুড়া  জেলাতে আরএসএস গোলমাল পাকাতে টাকা দিয়ে লোক রেখেছে বলে অভিযোগ করেন। মুখ্যমন্ত্রী এবিষয়ে নেতাদের সজাগ থাকার নির্দেশ দেন।

Spread the love

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।