অতিথি কলম প্রথম পাতা

নতিস্বীকার  যোগী প্রশাসনের! প্রিয়াঙ্কায় বিজেপি আতঙ্কিত কেন?

কণাদ দাশগুপ্ত

কংগ্রেস বলে দেশে কিছু নেই। জন সমর্থন নেই। সংসদে হতাশজনক সদস্যসংখ্যা। এমনই তো সবসময় বলে থাকেন মোদি-শাহ। ঠিকই, উত্তরপ্রদেশে কংগ্রেসের উপস্থিতি নগন্য। রাহুল গান্ধী স্বয়ং পরাজিত হয়েছেন। এবং দেশের প্রধানমন্ত্রী এই রাজ্যের সাংসদ। তাহলে প্রিয়াঙ্কা গান্ধীতে বিজেপির এত ভয় কেন? কোন অজানা আতঙ্কে যোগী আদিত্যনাথের পুলিশ সোনভদ্রে যাওয়ার পথে প্রিয়াঙ্কা গান্ধীকে আটকালো এবং বন্দি করে চুনার দুর্গে পাঠালো ? এ কোন গনতন্ত্রের নজির বিজেপি দেশজুড়ে সৃষ্টি করছে ? এই একই ধরনের ঘটনা যদি পশ্চিমবঙ্গের তৃণমূল সরকার বিজেপির কোনও জাতীয় নেতা-নেত্রীর সঙ্গে ঘটাতো, কি বলতেন মোদি-শাহ ? কি বিবৃতি হতো বিজেপি’র ? ‘ঢাল-তরোয়ালহীন নিধিরাম সর্দার’ এক মহিলাকে এততো ভয় 56-ইঞ্চি ছাতি-ওয়ালাদের ? উত্তর প্রদেশের সোনভদ্রের উভা গ্রামে ঠাণ্ডা মাথায় গত বুধবার আদিবাসীদের গণহত্যা করা হয়েছে। জমি দখলে বাধা পাওয়ায় গ্রামের প্রধানের দুষ্কৃতী বাহিনীর নির্বিচার গুলিতে মৃত্যু হয়েছে 10 আদিবাসীর, জখম বহু। এই ঘটনায় প্রশ্ন উঠছে যোগী আদিত্যনাথের রাজ্যের আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে। উত্তর প্রদেশে দলিত, সংখ্যালঘু, আদিবাসীদের নিরাপত্তা নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন উঠছে। বড়ভাবে উঠে এসেছে আরও একটি প্রশ্ন,

যোগী আদিত্যনাথ কি আদৌ প্রশাসক হওয়ার যোগ্য ?

উত্তরপ্রদেশের ভারপ্রাপ্ত AICC-র সাধারন সম্পাদক প্রিয়াঙ্কা গান্ধীর নেতৃত্বে কংগ্রেসের একটি প্রতিনিধি দল শুক্রবার নিহতদের পরিবারদের সঙ্গে দেখা করতে সোনভদ্রে যাচ্ছিলেন। সোনভদ্রে যাওয়ার আগেই মির্জাপুরের কাছে  আটকে দেওয়া হয় প্রিয়াঙ্কা গান্ধীকে। তারপর  তাঁকে আটকও করে যোগীর পুলিশ। গাড়ি থেকে নেমে প্রিয়াঙ্কা গান্ধী যোগীর পুলিশকে প্রশ্ন করেন, ‘আইনের কোন ধারায় তাঁদের আটকানো হচ্ছে? প্রিয়াঙ্কার প্রবল ব্যাক্তিত্বে খেই হারান পুলিশ কর্তারা। ভুলভাল উত্তর দিতে থাকেন। আসলে জোর করে কিছু চাপাতে চাইলে ফাঁক থেকেই যাবে। তেমনই হলো। পুলিশ জানায়, সোনভদ্রে 144 ধারা জারি। প্রিয়াঙ্কা জানান, আইন ভাঙার প্রশ্নই নেই। তিন জনকে নিয়েই যাব।  পুলিশ তাতেও অনুমতি দেয়নি। প্রিয়াঙ্কার পরের প্রশ্ন, ‘‘আমাকে আটকাচ্ছেন কিসের ভিত্তিতে? কোনও লিখিত নির্দেশ আছে? পুলিশ এই প্রশ্নের উত্তরেই সব ফাঁস করে বলেই ফেলে, “উপর থেকে ফোন এসেছে।” কার ফোন? তার কোনও জবাব নেই! এসবের প্রতিবাদে রাস্তাতেই ধর্নায় বসে পড়েন প্রিয়াঙ্কা। প্রিয়াঙ্কাকে শেষ পর্যন্ত গাড়িতে তুলে পুলিশ নিয়ে যায়। গাড়িতে বসে প্রিয়াঙ্কা বলেন, ‘আমি জানি না, কোথায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে! পরে জানা যায়, প্রিয়াঙ্কাকে ‘আটক’ করে চুনার দুর্গের অতিথিশালায় রাখা হয়েছে। কংগ্রেসের অভিযোগ আটক নয়, গ্রেফতার করা হয়েছে। সন্ধ্যায় প্রিয়াঙ্কাকে 50 হাজার টাকা মুচলেকার বিনিময়ে মুক্তির প্রস্তাব দেয় যোগী সরকার। গেস্ট হাউসের আলো, জল বন্ধ করে দেওয়া হয়। কিন্তু প্রিয়াঙ্কা জানিয়ে দেন, এখানে 10 দিন থাকতে হলে থাকবো। কিন্তু নিহতদের পরিবারের সঙ্গে দেখা না করে একচুলও নড়ব না। বিজেপি তথা উত্তরপ্রদেশ সরকারকে ফাঁটা বাঁশে আটকে দিয়েছেন প্রিয়াঙ্কা গান্ধী।

আর এরপর স্বাভাবিকভাবেই খবরের শিরোনামে চলে এলেন প্রিয়াঙ্কা গান্ধী। যোগী আদিত্যনাথের নির্বুদ্ধিতায় ছন্নছাড়া কংগ্রেসকে এক ঝটকায় লাইমলাইটে এনে দিলেন প্রিয়াঙ্কা।  প্রশ্ন এখানেই, প্রিয়াঙ্কা গান্ধীকে কেন এতো ভয় পাচ্ছেন মোদি-শাহ ? প্রিয়াঙ্কার গতিবিধিতে বিজেপির হাঁটু এভাবে কেঁপে উঠছে কেন? এই ঘটনার পর প্রিয়াঙ্কার সঙ্গে ইন্দিরা গান্ধীর তুলনা করা হচ্ছে দেশজুড়ে। জরুরি অবস্থার পর 1977 সালের ভোটে হেরে যান ইন্দিরা গান্ধী। সেই হারের 5 মাসের মধ্যে এক মাঝরাতে ইন্দিরা আচমকাই হাতির পিঠে চেপে পৌঁছে যান বিহারের বেলচি গ্রামে। বেলচিতে কিছুদিন আগে উচ্চবর্ণের হাতে খুন হন 11 জন দলিত। রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের অভিমত, সেই ঘটনার তিন বছরের মাথায় ইন্দিরার ক্ষমতায় ফিরে আসার পিছনে মধ্যরাতের সেই যাত্রা বিশালভাবে কাজে লেগেছিল। 42 বছর পরে সেই একই পথ নিলেন ইন্দিরার নাতনি, প্রিয়াঙ্কা গান্ধী, যোগী-প্রশাসনের হঠকারিতায়। রাজনৈতিক দূরদর্শিতার যে অভাব আছে তাঁর, গোটা দেশের সামনে নিজেই তা মেলে ধরলেন যোগী আদিত্যনাথ।

প্রশ্ন হলো, প্রিয়াঙ্কা গান্ধীকে আটকে বিজেপি, কেন্দ্রীয় সরকার বা উত্তরপ্রদেশ সরকারের রাজনৈতিক লাভ কতখানি হলো? আদৌ কি এক ফোঁটাও লাভ হয়েছে ? প্রিয়াঙ্কা যেতেন, ঘুরে আসতেন, বিবৃতি দিতেন। দু-একদিনের মধ্যেই তো লোকজনের মন থেকে সরে যেতো ঘটনাটি। তাতে মোদি বা যোগীর বিজেপির কী এমন আকাশ ভেঙ্গে মাথায় পড়তো? এখন পরিস্থিতি যেখানে গড়িয়েছে, তাতে মোদি-যোগী কি অস্বস্তিতে নেই ? প্রিয়াঙ্কা গান্ধী কি সত্যিই বিজেপির কাছে এই মুহূর্তে ‘থ্রেট’ হয়ে উঠেছেন? আসলে যোগী-র রাজ্যে আইন-শৃঙ্খলা ও পুলিশ প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে বারবার প্রশ্ন উঠছে। দলিত,সংখ্যালঘু, আদিবাসীদের উপর উচ্চবর্ণের অত্যাচার মাত্রা ছাড়িয়েছে বিজেপি শাসনে। এসব অত্যাচার রুখতে নরম মনোভাব নিয়ে সরকারের নীতি পরিষ্কার করে দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ। বিজেপির শাসনে ভয়াবহ নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন উত্তরপ্রদেশের দলিত, সংখ্যালঘু, আদিবাসীরা। প্রিয়াঙ্কা গান্ধীকে স্বজনহারা দলিতদের মুখোমুখি হতে দিলে পর্দা ফাঁস হয়ে যাবে। তাই যেভাবেই হোক আটকাও প্রিয়াঙ্কাকে। মৌখিক সেই নির্দেশে আইনকানুনের তোয়াক্কা না করেই যোগীর পুলিশ বেআইনিভাবে প্রিয়াঙ্কা গান্ধীকে ‘বন্দি’ করে চুনার দুর্গে পাঠিয়ে বিজেপি নিজেরাই বুঝিয়ে দিলো, আসলে প্রিয়াঙ্কা গান্ধীর গতিবিধিতে তারা আতঙ্কিত। প্রিয়াঙ্কাতে মাঠজুড়ে খেলতে দিলে যে কোনও মুহূর্তে বিজেপিকে দশ গোল মেরে দেবে। সেই ‘বিপদ’ থেকে কে উদ্ধার করবে বিজেপিকে ? সংসদে বিজেপির প্রশ্নাতীত গরিষ্ঠতা, উত্তরপ্রদেশে প্রায় শেষ কংগ্রেস। প্রিয়াঙ্কা গান্ধী কোনও স্তরের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি নন। তারপরেও বিজেপির কিসের এতো আতঙ্ক ? গনতান্ত্রিক কর্মসূচিতে চরম পর্যায়ে বাধা দিয়ে বিজেপি-শাসিত উত্তরপ্রদেশ বিরোধী দলকে যে ভাবে হেনস্তা করছে, সেই এক ঘটনা বিজেপি-বিরোধী দলের শাসনে থাকা রাজ্যে কখনও তো ঘটতেই পারে। এ রাজ্যেও হতে পারে। সেদিন বিজেপির ‘টিম-56 ইঞ্চি’-র গলা ফোলানো প্রতিবাদকে দেশের মানুষ যে স্রেফ ভণ্ডামি হিসেবেই গ্রহণ করবে, বিজেপি আশাকরি সেটা বুঝছে ।

 

Spread the love