কলকাতা প্রথম পাতা

পিকের পরামর্শ নিয়ে তৃণমূল নেতারাই দোলাচলে

নিজস্ব প্রতিনিধি— মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নজরুল মঞ্চে যখন পিকের দেওয়া প্রেসক্রিপশন পড়ছেন, তখন তৃণমূলের বাছাই করা নেতারা একে অপরের মুখের দিকে তাকিয়ে। কৌতুহল মেটার তো শেষ নেই, ক্রমশ তা বাড়ছে। বেশ কয়েকজন চাপাস্বরে নিজেদের মধ্যে বলছেন, ‘আমাদের তো আর দরকার নেই। এবার থেকে যা নির্দেশ আসবে তাই করব। অভিযোগ নেওয়ারও দরকার নেই। কারণ, এবার থেকে সরাসরি অভিযোগ যাবে ‘দিদি’র কাছে। কারণ, ধরুন একপক্ষ নেতাদের কাছে অভিযোগ জানাল, অন্যপক্ষ চলে গেল দিদির নাম্বারে। তখন কি হবে? এই নিয়েও নেতাদের মধ্যে ধোঁয়াশা কম নয়। তবে সব কিছু ছাপিয়ে গ্রামে গিয়ে রাত কাটানোর এই অভিনব পন্থায় কিছুটা হলেও বেকায়দায় তৃণমূলের বাছাই করা নেতারা। জেলায় যাঁরা থাকেন, তাঁদের সমস্যা খুব একটা হবে না। কিন্তু অন্য পরিবেশ গ্রামে কাটানো নিয়ে নিজেদের মধ্যে যেমন কৌতুহল তৈরি হয়েছে, তেমনি শেষ পর্যন্ত পিকের এই কৌশল তৃণমূলে কতটা বাস্তবায়িত হয়, তা নিয়ে নেতাদের মধ্যে শুরু হয়েছে গুঞ্জন। তবে গ্রামে রাত কাটানো হলে তৃণমূলের কিছুটা হলেও যে লাভ হবে, তা অনেক নেতাই ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বলছে। সব মিলিয়ে নেতাদের কি ডানা ছাঁটা হচ্ছে না? তা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। প্রবাদ আছে ‘অল বেঙ্গল থিঙ্কস টু ডে, অল ইন্ডিয়া থিঙ্কস টুমরো’। তৃণমূলে থাকা সেই বাংলার রাজনৈতিক নেতাদের এখন পথ দেখাচ্ছেন পিকে।

এদিকে, মনে পড়ে ২০১৭ সালের ২৫ এপ্রিল দিনটার কথা? সেদিন দেশের বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তথা সর্বভারতীয় বিজেপির সভাপতি অমিত শাহ একেবারে নীচুতলার মানুষের সঙ্গে জনসংযোগ বাড়াতে নকশালবাড়ির রাজু মহালির বাড়িতে বসে কলাপাতায় মুগডাল, পটল ভাজা, ধোঁকার ডালনা সহযোগে দুপুরের আহার সেরে ছিলেন। পাশে ছিলেন রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষও। একই ভাবে ভবানীপুরে এক দলীয় সমর্থকের বাড়িতেও মধ্যাহ্নভোজ সেরেছিলেন তিনি। এই ভোজ সারার সঙ্গে সঙ্গে দলের নীচুতলার নেতা-কর্মীদের বিজেপির প্রতি জোটবদ্ধ হওয়ার বার্তাও দিয়েছিলেন। তার ফলও পেয়েছে বিজেপি। লোকসভায় ২ থেকে ১৮টি আসনে পৌঁছেছে। এছাড়া বেশ কয়েকটি আসনে অল্প মার্জিনে হার হয়েছে বিজেপির।

এদিকে দেরিতে হলেও দু’বছর তিন মাস পরে সেই একই পথে হাঁটতে চলেছে রাজ্যের শাসক দল। তবে তারা জনসংযোগ বাড়াতে আরও একটু বেশি কিছু করছেন। সোমবার নজরুল মঞ্চে দলের জেলা সভাপতি ও বিধায়কদের সঙ্গে বৈঠকের পর সাংবাদিক বৈঠক করেন তৃণমূলনেত্রী। সেখানেই তিনি জানান, এ বার থেকে জনসংযোগে দলের জনপ্রতিনিধিরা গ্রামে গ্রামে যাবেন। কথা বলবেন দলের কর্মী এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে। শুধু সেটা করেই চলে এলে হবে না। কোনও এক বুথকর্মীর বাড়িতে বসে সবাইকে নিয়ে একসঙ্গে খাওয়াদাওয়া করবেন। রাতে থাকতে হবে সেখানেই। তারপর গ্রাম বা পাড়া ছাড়ার আগে, সেখানে তৃণমূল কংগ্রেসের পতাকা উত্তোলন করে তারপর আসবেন।

নজরুল মঞ্চ থেকে টার্গেট বেঁধে দেওয়া হয়েছে। আগামী ১০০ দিনের মধ্যে এক হাজার জনপ্রতিনিধি ১০ হাজার গ্রামে যাবেন। দিদি এ-ও বলে দিয়েছেন, “কেউ ইচ্ছে মতো যেতে পারবেন না। কাকে, কী ভাবে কোথায় পাঠানো হবে, তা স্টেট হেডকোয়ার্টার ঠিক করবে।” তাঁর কথায়, “শহরে-প্রান্তরে, গ্রাম-গ্রামান্তরে, জেলা-জেলাস্তরে জনসংযোগের নতুন মাধ্যম শুরু হল।”

জনসংযোগ বাড়াতে তৃণমূল এই প্রদ্ধতি নতুনভাবে শুরু করলেও এর আগে বিভিন্ন দলের নেতা-কর্মীরা এই ধরনের প্রদ্ধতি অবলম্বন করেছে। আরএসএস-এর নেতাদের দেখা গিয়েছে গ্রামে গ্রামে মানুষের বাড়িতে রাত্রিযাপন করতে। এমনকি বাম ট্রেড ইউনিয়ন বা কৃষক নেতারাও রাত কাটিয়েছেন কোনও কারখানার শ্রমিক বস্তিতে অথবা কোনও ক্ষেতমজুর মহল্লায়। গত বছরের সেপ্টেম্বর মাস থেকে বাংলার গ্রামে রাত কাটানো শুরু করেছিলেন আরএসএস থেকে উঠে আসা বিজেপি নেতারা। কেন্দ্রীয় মন্ত্রী রামদাস মেঘওয়ালকে দেখা গিয়েছে কেশিয়াড়িতে রাত কাটাতে, অরবিন্দ মেননকে দেখা গিয়েছে জলপাইগুড়ির গ্রামে গিয়ে থাকতে। এ বার সেই রাস্তাতে হাঁটতে চলেছে তৃণমূল। দিদি জানিয়ে দিয়েছেন, কোনও জনপ্রতিনিধি তাঁর কেন্দ্রের বাইরে যাবেন না। নিজের কেন্দ্রেই তাঁকে এই কাজ করতে হবে।

কিন্তু আট বছর রাজত্ব করার পর নতুন জনসংযোগ বাড়াতে হচ্ছে কেন?

কারণ লোকসভার ফল। তাতে একবারে স্পষ্ট হয়ে গিয়েছে। একেবারে নীচুতলার কর্মীদের সঙ্গে উপরতলার কর্মীদের কোনও যোগাযোগ নেই। যার পুরোপুরি ‘ফল’ পেয়েছে বিজেপি। এবার সেই বিপর্যয়ের নিরাময় করতে পিকে-র শরণাপন্ন হয়েছে দল। যদিও মমতা এ দিন বলেছেন, “ইলেকশন এখনও পৌনে দু’বছর বাকি। তাই এটা কোনও ভোটের প্রচার নয়। এটা জনসংযোগের নতুন মাধ্যম।”

Spread the love