কলকাতা প্রথম পাতা

বিজেপির পালে হাওয়া কাড়তে পিকের প্রেসক্রিপশন পড়বেন মমতা

দেবাশিস দাস

রোগ নির্ণয় করা গিয়েছে। কিন্তু উপশম কি ভাবে সম্ভব? স্বাস্থোদ্ধারে ঘনঘন বৈঠকে বসছে শাসক দল। পরামর্শদাতা হিসাবে কাজ করছেন প্রশান্ত কিশোর। যে প্রেসক্রিপশন করে দেওয়া হচ্ছে তার বাস্তব প্রয়োগ কিভাবে সম্ভব তা নিয়েই চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। এতদিন প্রচারের প্রায় সব আলো শুষে নিতেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁকে ঘিরেই যাবতীয় জল্পনা থাকত। এবার এক্ষেত্রেও সামান্য পরিবর্তন এসেছে। মুখ্যমন্ত্রীর পর শুভেন্দু অধিকারী, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়, পার্থ চট্টোপাধ্যায়দের সংবাদ মাধ্যমের প্রচারের আলোয় থাকতে দেখা গিয়েছে। এবার সেই তালিকায় নতুন সংযোজন প্রশান্ত কিশোর। মূলত তাঁর মস্তিষ্কপ্রসূত পরিকল্পনার উপর নির্ভর করে এবং সেই সঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের অভিজ্ঞতার মিশেলের উপর ভর করে ২০২১ এ রাজ্যের প্রশাসনিক ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তন চায় তৃণমূল। কাজটা নেহাতই কঠিন না হলেও মসৃণ নয়। কারণ লোকসভা নির্বাচনে রাজ্যে গেরুয়া আধিপত্য বিস্তার হওয়া। বিজেপির পালে হাওয়া কেড়ে নিয়ে সেই হাওয়া তৃণমূলের পালে যাতে লাগতে পারে এবং পরবর্তী নির্বাচনগুলিতে ঘাসফুলের দাপট যাতে বাড়ে সেকথা মাথায় রেখে নতুনভাবে সংগঠন সাজাতে চাইছে তৃণমূল। তারই অঙ্গ হিসাবে আজ সোমবার নজরুল মঞ্চে তৃণমূল কংগ্রেসের বাছাই করা নেতাদের নিয়ে মমতার বৈঠক নিঃসন্দেহে গুরুত্বপুর্ণ এমনটাই মনে করছেন শাসক নেতারা। এতদিন পিকের পরামর্শ দিয়েছেন নেপথ্যে থেকে। এদিনের বৈঠকেও তিনি থাকবেন কিনা তা নিয়ে যথেষ্টজল্পনা রয়েছে। তবে তিনি বৈঠকে সশরীরে উপস্থিত থাকুন কিংবা নাই থাকুন এদিন তৃণমূল সুপ্রিমো যে নতুন নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করবেন তাতে প্রশান্ত কিশোরের ভাবনার উজ্জ্বল উপস্থিতি থাকবে এমনটাই উপস্থিতি জানা যাচ্ছে। সেকারণেই শাসক নেতাদের মধ্যে নতুন করে এই বৈঠককে ঘিরে কৌতুহল সৃষ্টি হয়েছে। যতদূর জানা যাচ্ছে, বুথভিত্তিক বিজেপি বিরোধীতাকে তুঙ্গে নিয়ে যেতে অ্যান্টি বিজেপি ফ্রন্ট বুথে বুথে তৈরির জন্য তৃণমূল স্তরের নেতাদের বিশেষ নির্দেশ দেওয়া হতে পারে এদিনের বৈঠক থেকে। সেক্ষেত্রে বাম কংগ্রেস তারা রাজনৈতিক মতাদর্শভাবে তৃণমূলের বিরোধী হলেও প্রয়োজনে বুথভিত্তিক তাদেরকে কাছে পাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হতে পারে শাসক দলের বাছাই করা নেতাদের। সেই সঙ্গে সমাজের বিশিষ্ট জনদের যারা মাঠে নেমে হয়তো সক্রিয় ভাবে তৃণমূল করেন না তাদেরকে আরও বেশি করে যুক্ত করার জন্য বলা হতে পারে। সবসময় শাসক দলের ব্যানারে রাজনৈতিক কর্মসুচি না করে প্রয়োজনে অরাজনৈতিক কর্মসূচিতে শাসক দলের নেতাদের উপস্থিতি যাতে থাকে সে বিষয়েও দিক নির্দেশ দিয়ে পারেন তৃণমূল সুপ্রিমো। বেশ কিছু ক্ষেত্রে দেখা গিয়েছে দুর্বল নেতারা অনেক গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় আলো করে বসে রয়েছেন শাসকদলের সৌজন্যে। ভালো কাজ করা সত্ত্বেও এলাকায় অনেক জনপ্রিয় নেতা ব্যাকফুটে রয়েছেন, কিংবা কম গুরুত্বপূর্ণ পদে রয়েছেন। তাদের কথাও বিশেষভাবে ভাবতে চলেছে দল। সেই সঙ্গে নেতাদের দায়িত্ব সঠিক ভাবে বন্টন করে দেওয়ার কথা শোনা যাচ্ছে। যিনি বুথের দায়িত্বে থাকবেন তিনি বুথটুকুই দেখবেন, যিনি অঞ্চলের কিংবা ব্লকের দায়িত্বে থাকবেন তার কাছ থেকে সেটুকুই বুঝে নেবে দল। কিন্তু তা না করে অনেককে দেখা গিয়েছে নিজেদের এলাকায় তিনি পরাজিত হয়েছে অথচ অন্যত্র গিয়ে তিনি সভা সমিতি করছেন, বক্তব্য রাখছেন। এরফলে দল তার কাছ থেকে সঠিকভাবে তার পারফরমেন্স বুঝে নিতে পারছে না। এক্ষেত্রে গন্ডি এঁকে দিতে চাইছে দল। এখনও যারা অভিমানে দুরে সরে রয়েছেন কিংবা পুরনো কর্মী বসে গিয়েছেন তাদেরকে ফেরানোর যে ডাক একদিন তৃণমূল সুপ্রিমো দিয়েছেন তা বাস্তবে কতটা কার্যকরী হল তাও বিজ্ঞানসম্মতভাবে খতিয়ে দেখবে দল। প্রতিটি ব্লকের রাজনৈতিক চরিত্র শুধু নয় সেখানে কোন জাতি বা উপজাতির মানুষ বসবাস করেন তাদের নুন্যতম চাহিদা এখন সরকারের কাছে কি রয়েছে তার সমীক্ষাও শুরু হয়েছে শাসক দলের অন্দরে।

এখানেই শেষ নয়, রাজ্যের সত্তর হাজার বুথ ধরে ধরে কি করলে এই বুথগুলি তৃণমুলের পক্ষে আসবে তারও খতিয়ান নেওয়া শুরু করেছে পিকের টিম। আগামীতে বুথ ধরে ধরে পরামর্শ বাতলে দেওয়া হবে কলকাতা থেকে। বিরোধী কোন নেতা এবং তার অনুগামীদের নিজেদের স্বপক্ষে নিয়ে আসতে পারলে ভোটে শ্রীবৃদ্ধি ঘটবে তাও জানিয়ে দেওয়া হবে। আগামী দিনে এই প্রেসক্রিপশনের উপর নির্ভর করেই শাসক নেতাদের বুথ স্তর পর্যন্ত সংগঠন জোরদার করতে হবে তবে তার আগে রাজ্য পুরসভার নির্বাচন রয়েছে। এপ্রিল মে মাস নাগাদ পুরসভা নির্বাচন হবে। হাতে সাত থেকে আট মাস সময় রয়েছে। এই সময়সীমার মধ্যে পিকের পরামর্শ তৃণমূলের ভোট ব্যাঙ্কের স্বাস্থ্যোদ্ধারে কতটা সক্ষম হল তা বুঝে নিয়েই একুশের বিধানসভা নির্বাচনে ঝাঁপাবে তৃণমূল।

তবে জেলার নেতাদের যেভাবে ঘনঘন কলকাতায় ডেকে বৈঠক করা হচ্ছে এবং তাদের গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে তাতে করে শাসক দলের জেলার স্তরের শীর্ষ নেতারা রীতিমতো খুশি। নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক দক্ষিণবঙ্গের এক প্রভাবশালী তৃণমূল নেতার কথায়, কলকাতার ফর্মুলা জেলায় না চাপিয়ে যদি এবার জেলা থেকে উঠে আসা বাস্তব তথ্যের উপর নির্ভর করে দল পরিচালনা হয় তাহলে বিজেপিকে রোখা খুব একটা কঠিন হবে বলে মনে হয় না। দলের নেতাদের মধ্যে প্রতিযোগিতা মূলক পরিবেশ তৈরি করতে হবে। যেখানে কোনও লবি কাজ করবে না। পারফরমেন্সই শেষ কথা বলবে। তাহলে ঘুরে দাঁড়ানোটা খুব একটা। কঠিন হবে না।

Spread the love