অতিথি কলম প্রথম পাতা লাইফ স্টাইল

এই দুঃসময়ে মনে পড়ছে রবীন্দ্রনাথকেই -বিশিষ্ট কবি সৈয়দ হাসমত জালাল।

এই পরিস্থিতিতে, পঁচিশে বৈশাখে, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মদিনটিতে বারবার মনে পড়ে যাচ্ছে তাঁর কবিতা, তাঁর গান, তাঁর মানবতার আদর্শের কথা। ব্রাহ্ম পরিবারে তাঁর জন্ম, ব্রাহ্মপ্রথার মধ্যে দিয়ে তাঁকে যেমন যেতে হয়েছে, তেমনি তিনি গেছেন সনাতন ধর্মের বহু প্রথা ও সংস্কারের মধ্যে দিয়েও। কিন্তু তাঁর মনের আশ্চর্য প্রসারতার কারণেই তাঁর পক্ষে সম্ভব হয়েছিল এইসব প্রথা ও সংস্কারের গণ্ডী পেরিয়ে গিয়ে ‘মানুষের ধর্ম’-এর কথা বলার। এমনকি প্রথাগত ধর্মাচরণের বিরুদ্ধেও তিনি বলেছেন, ‘ভজন পূজন সাধন আরাধনা সমস্ত থাক পড়ে।/ রুদ্ধদ্বারে দেবালয়ের কোণে কেন আছিস ওরে!’ ‘ধূলামন্দির’ কবিতায় তিনি বলেছেন, ‘নয়ন মেলে দেখ্ দেখি তুই চেয়ে– দেবতা নাই ঘরে।’ তাহলে দেবতা কোথায়? আসলে তিনি তো মানুষের দেবতা, মানুষের দুঃখসুখের মধ্যে তিনি আছেন, আছেন মানবসেবার মধ্যে, মানুষের কর্মের মধ্যে। তাই তো মাটি ভেঙে চাষা যেখানে চাষ করছে, পাথর ভেঙে তারা পথ কাটছে, বারোমাস খেটে চলেছে, দেবতা তো সেখানেই গেছেন। ‘রৌদ্রে জলে আছেন সবার সাথে,/ ধূলা তাঁহার লেগেছে দুই হাতে–/ তাঁরি মতন শুচি বসন
ছাড়ি আয় রে ধূলার পরে।’ রুদ্ধঘরের ধ্যান, ফুলের ডালি– এসবের প্রয়োজন নেই।কর্মের মধ্যে দিয়েই তাঁর সঙ্গে একাত্ম হতে হবে।

সমগ্র বিশ্ব যখন আজ মহামারিতে আক্রান্ত, আমাদের দেশও তার বাইরে নয়। এক প্রবল দুঃসময়ের মধ্যে দিয়ে চলেছি আমরা। প্রতিদিনই মৃত্যুর সংখ্যা লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। শ্রমজীবী মানুষদের দুর্দশার অন্ত নেই। এসময় জাতপাত নয়, ধর্ম নয়, বিপন্ন মানুষের পাশে দাঁড়ানো, তাদের মুখে দু-মুঠো আহার তুলে দেওয়াই এখন মানুষের কাজ।
এই দুঃসময়ে মন্দির-মসজিদ- গির্জা অর্থাৎ সেই অর্থে ধর্ম নয়, এখন মানুষের পরিত্রাণের জন্যে জেগে আছে বিজ্ঞান। বিজ্ঞানী, চিকিৎসক, স্বাস্থ্যকর্মীরা যেভাবে এই হন্তারক-বীজাণুতে আক্রান্ত মানুষের জন্যে দিনরাত কাজ করে যাচ্ছেন, তাতে তাঁরাই এখন ঈশ্বরের ভূমিকায়। তাঁরাই এখন মানুষের রক্ষাকর্তা। পৃথিবীর সব উপাসনাগৃহ এখন বন্ধ, খোলা আছে শুধু চিকিৎসালয়। প্রাতিষ্ঠানিক ধর্ম নয়, আজ মানুষের পাশে আছে শুধু মানবসেবার ধর্ম।
টেলিভিশনের পর্দায়, সংবাদপত্রের খবরে ও ছবিতে হাজার হাজার শ্রমিকের দুরবস্থা আমাদের চোখে পড়েছে। বড়ো শহরগুলিতে তাঁরা গ্রাম ছেড়ে এসেছিলেন জীবিকার সন্ধানে। এখন হঠাৎই লকডাউনের ঘোষণায় তাঁরাই সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়েছেন। তাঁদের কাজ নেই, প্রতিদিন খাবার জুটছে না– তাঁরা ফিরতে চাইছেন গ্রামে। তাঁদের জন্যে কোনো পরিবহন ব্যবস্থা নেই। প্রবল রৌদ্রের মধ্যেই তাঁরা পায়ে হেঁটে চলেছেন কয়েকশো মাইল দূরের গ্রামের দিকে। সঙ্গে পরিবারের মহিলারাও। কাঁধের উপর ঘুমে ঢলে পড়েছে ক্ষুধার্ত শিশু। বেশ কিছু মানুষ মারাও গেছেন এভাবে চলতে চলতে। তাঁদের প্রতি দেশের সরকারের ঔদাসীন্য আমাদের নজর এড়ায়নি। মানুষ হিসেবে তাঁদের বেঁচে থাকার সামান্য অধিকারটুকুও কি তাঁদের প্রাপ্য নয়?
এখানেও মনে পড়ে যায় রবীন্দ্রনাথকে। প্রায় ভবিষ্যতবাণীর মতোই তিনি সতর্ক করে দিয়েছেন আমাদের, মানুষের প্রতি এই অবহেলায়, মনুষ্যত্বের এই অপমানে তাঁর উচ্চারণের মধ্যে ধ্বনিত হয়েছে একধরনের ভর্ৎসনাও। ভর্ৎসনা দেশের শাসকশ্রেণির প্রতি। ‘অপমানিত’ কবিতায় তিনি বলেছেন, ‘মানুষের অধিকারে বঞ্চিত করেছ যারে,/ সম্মুখে দাঁড়ায়ে রেখে তবু কোলে দাও নাই স্থান,/ অপমানে হতে হবে তাহাদের সবার সমান।’

ইদানিং কালে আমাদের দেশে ধর্ম নিয়ে বড়ো বাড়াবাড়ি চোখে পড়ে। ধর্মের নামে মানুষের মধ্যে, সমাজের মধ্যে, হাজার রকমের জাতপাতের নামে মানুষকে উঁচু-নিচু শ্রেণিতে ভাগ করে রাখার,(বিভাজন । আজ বিজ্ঞান যখন এত উন্নত পর্যায়ে পৌঁছেছে, সেখানে ) অন্যদের প্রতি ঘৃণা-বিদ্বেষ ছড়িয়ে ‘অপর’ করে রাখার খেলা যেন আরও বেড়ে গেছে। এসময় মনে পড়ে রবীন্দ্রনাথের কবিতার পঙক্তি, ‘মানুষের পরশেরে প্রতিদিন ঠেকাইয়া দূরে/ ঘৃণা করিয়াছ তুমি প্রাণের ঠাকুরে।’
এই মহামারী, এই দীর্ঘ লকডাউনের ফলে ভারতের তথা বিশ্বের অর্থনীতি আজ এক প্রবল বিপদের মুখে এসে দাঁড়িয়েছে। আমাদের দেশের প্রায় সত্তর ভাগ মানুষ যেখানে দারিদ্রসীমার আশেপাশে রয়েছে, সেখানে তাদের দু-বেলা খাবার জুটবে তো? ইতিমধ্যেই এদেশে কয়েক কোটি লোক কাজ হারিয়েছে। আশঙ্কা হয়, সত্যিই কি এমন পরিস্থিতির মধ্যে আমাদের পড়তে হবে, যেদিন, রবীন্দ্রনাথের কথায়, ‘বিধাতার রুদ্ররোষে দুর্ভিক্ষের-দ্বারে বসে/ ভাগ করে খেতে হবে সকলের সাথে অন্নপান’? আসন্ন দুর্ভিক্ষ না হলেও, একটা বড়ো অংশের মানুষের অর্ধাহার, অনাহারের আশঙ্কা অর্থনীতিবিদরাও উড়িয়ে দিচ্ছেন না।
‘চরণে দলিত হয়ে ধুলোয় সে যায় বয়ে–/ সেই নিম্নে নেমে এসো, নহিলে নাহি রে পরিত্রাণ।’ যে মানুষের প্রাণের ঠাকুরকে ঘৃণা করার কথা এখানে উল্লেখ করেছেন রবীন্দ্রনাথ, তিরস্কার করেছেন, সেই মানুষদেবতার বন্দনার কথা আমরা দেখি তাঁর ‘ভারততীর্থ’ কবিতায়– ‘হেথায় দাঁড়ায়ে দু বাহু বাড়ায়ে মনে নরদেবতারে।’ এই ভারততীর্থে সবার-পরশে-পবিত্র-করা তীর্থনীরে মঙ্গলঘট ভরতে হবে। আমরা কি শুনেছি তাঁর সেই মহামানবতার আহ্বান?
আজ এই দুর্দিনে, এত লক্ষ লক্ষ নিঃসহায় মানুষকে পথ হেঁটে যেতে দেখে বারবার মনে পড়ছে রবীন্দ্রনাথকে– ‘শতেক শতাব্দী ধরে নামে শিরে অসম্মানভার,/ মানুষের নারায়ণে তবুও কর না নমস্কার।’

Spread the love