জেলা প্রথম পাতা লগডাউন

একে করোনা, তায় দোসর পর পর কালবৈশাখি পাকা ধানে মই দিচ্ছে ।

বাংলার চাষির একপ্রকার মাথায় হাত। এখন বাংলার মাঠ ভরে উঠেছে বোরোর ফলনে। পুরুষ্টু ধান কাটার সময়ও এসে গিয়েছে। কিন্তু পরপর কালবৈশাখি আর সঙ্গে নিয়ে আসা শিলাবৃষ্টিতে মাঠের ধান মাঠেই লুটিয়ে পড়ছে। গত শুক্রবারের কালবৈশাখি ও শিলাবৃষ্টিতেই ক্ষতি হয়েছিল বেশ কয়েক হেক্টর জমির ধানের। পরদিন সকালে মাঠের ধানের অবস্থা দেখে অনেক চাষিরই মাথায় হাত। তার দু দিন পরেই ফের কালবৈশাখি ও শিলাবৃষ্টির দাপটে আরও সঙ্কটে পূর্ব বর্ধমান, হাওড়া, হুগলির ধানচাষ। দিশাহারা অবস্থা চাষিদের। ঝড়-বৃষ্টিতে ফসলের ক্ষতি নিয়ে রাজ্যের কৃষি উপদেষ্টা প্রদীপ মজুমদার বলেন, ‘প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের সঙ্গে আমরা কীভাবে মোকাবিলা করব বলুন। আমরা চেষ্টা করছি দ্রুত হার্ভেস্টার মেশিন আনার। যে এলাকায় ধান পেকে গিয়েছে, সেই এলাকার ধান যাতে চাষিরা কেটে ঘরে নিয়ে যেতে পারেন, তার ব্যবস্থাকেই প্রাধান্য দিয়েছি আমরা।’
এ বার পূর্ব বর্ধমানে মোট বোরো ধানের চাষ হয়েছে ২১ হাজার ২০০ হেক্টর জমিতে। ১৭ এপ্রিলের ঝড়-বৃষ্টিতে ভাতার, বর্ধমান ১, খণ্ডঘোষ, বর্ধমান ২ ব্লকের ১২৪ মৌজার ২৫টি গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকার ৫ হাজার ৭০০ হেক্টর জমির ধান ক্ষতির মুখে পড়ে। সোমবার রাতের কালবৈশাখি আর শিলাবৃষ্টিতে সেই ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়িয়েছে। মঙ্গলবার সকালে বহু চাষি মাঠে গিয়ে অবস্থা দেখে ভেঙে পড়েন। ইতিমধ্যে অনেকে ধান কাটার কাজ শুরুও করেছিলেন। কিন্তু জমা জলে কেটে রাখা সেই ধান ডুবে গিয়েছে। রাজ্য কৃষি দপ্তরের নির্দেশে প্রতিটি ব্লকের কৃষি আধিকারিকরা নিজেদের এলাকায় ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ দেখতে বেরিয়ে পড়েন সকালেই।
এদিনের বৃষ্টিতে সবচেয়ে ক্ষতি হয়েছে বর্ধমান ২, রায়নার দু’টি ব্লকে। বর্ধমান-২ এর বন্ডুল ২ পঞ্চায়েতের সামন্তী গ্রাম সমেত আশপাশের বেশ কয়েকটি মৌজায় কয়েকশো হেক্টর জমির পাকাধানে মই দিয়েছে কালবৈশাখি।
বৃষ্টিতে ক্ষতি হয়েছে হুগলির আরামবাগ মহকুমার বিস্তীর্ণ এলাকার বোরো চাষ। হুগলি জেলা কৃষি দপ্তর সূত্রের খবর, সোমবারের ঝড় আর শিলাবৃষ্টিতে আরামবাগের খানাকুল ব্লকে ক্ষতি সবচেয়ে বেশি। খানাকুলের ঘোষপুর, কিশোরপুর, পোল, অরুন্ডা, পাতুল-সহ বিভিন্ন এলাকায় শিলাবৃষ্টির জেরে ধানের শিষ ঝরে পড়েছে। ঝড়ের দাপটে পাকা ধানগাছ জলে পড়ে নষ্ট হয়েছে। কোথাও আবার, কাটার পরে জমিতে রাখা পাকা ধান ভিজে নষ্ট হয়েছে। সব মিলিয়ে ব্লকের অন্তত ৭০ শতাংশ বোরো ফসলের ক্ষতি হয়েছে বলে দাবি, খানাকুল পঞ্চায়েত সমিতির পদাধিকারিদের। ব্লকের বিডিও দেবাশিস মণ্ডল বলেন, ‘বোরো চাষের ক্ষতি হয়েছে। আমরা পরিস্থিতি খতিয়ে দেখেছি। রিপোর্টও জমা দিতে বলেছি। সেই মতো ক্ষয়ক্ষতির সঠিক হিসেব বলা যাবে৷’
ক্ষতি হয়েছে কালনা মহকুমার মন্তেশ্বরেও। কালনার মহকুমা সহ কৃষি অধিকর্তা পার্থ ঘোষ বলেন, ‘ধান পড়ে গেলে সেটা পাওয়া যাবে না। ধান পাকার জন্য রৌদ্রজ্জ্বল মেঘমুক্ত আকাশ সহায়ক হয়। সোমবার রাতের ঝড়-বৃষ্টিতে বোরো ধানের ক্ষয়ক্ষতির হিসেব চলছে।’ অন্য দিকে, রায়না ২ ব্লকের বিডিও দীপ্যমান মজুমদার বলেন, ‘বৃষ্টি আর ঝড়ে এই ব্লকে ক্ষতি ভালোই হয়েছে। সকালে বিভিন্ন মাঠ ঘুরে যা দেখেছি তাতে ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ ধান নষ্ট হবে। কৃষি দপ্তরের পক্ষ থেকে বিস্তারিত রিপোর্ট তৈরি করা হচ্ছে।’
হাওড়ার উলুবেড়িয়া মহকুমায় শিলাবৃষ্টি তেমন হয়নি। তবে ঝড়-বৃষ্টির জেরে কিছু এলাকায় বোরো ধানের গাছ মাটিতে লুটিয়ে পড়ে ক্ষতি হয়েছে বলে আমতা-২ পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি সুকান্ত পাল জানান। উদয়নারায়ণপুর ব্লকের কৃষি আধিকারিক গৌতম পাইক জানান, এর পর বৃষ্টি হলে এলাকার পেঁয়াজ ও ধান চাষের ক্ষতি হতে পারে। তবে বোরো ধান ক্ষতির মুখে পড়লেও এই বৃষ্টিতে পাট, বাদাম এবং তিলচাষের উপকার হয়েছে বলে চাষিদের দাবি।
সবজি চাষেও ব্যপক ক্ষতি হয়েছে এই বৃষ্টিতে। পটল, বরবটি গাছের গোড়ায় জল জমেছে। জল দ্রুত বের করে দেওয়া না গেলে ফসল পচে যাবে। ঝড়ের দাপটে টম্যাটো, বেগুন গাছ ভেঙে পড়েছে। সব মাটিতে গড়াগড়ি খাচ্ছে। ভগবানপুরের সাতুলিয়ার মাঠে ভাল পেঁপে ও কলার চাষ হয়। বৃষ্টিতে অনেক পেঁপে ও কলা গাছও ভেঙে পড়েছে।

Spread the love