কলকাতা প্রথম পাতা

২১-শের জমায়েত নিয়ে অশনি সংকেত

কণাদ দাশগুপ্ত

■ লোকসভা ভোটে মহাপতন।
■ রাজ্যজুড়েই বিজেপি’র উত্থান।
■ দলীয় নেতা-কর্মীদের উপেক্ষা করে প্রশান্ত কিশোরের ওপর দলের শীর্ষ মহলের ভরসা।
■ কাটমানি-ইস্যুতে গোটা রাজ্যে তৃণমূল দলের কার্যত ভয়ে সিঁটিয়ে থাকা।
■ কাটমানি-ইস্যুতে রাজ্যের বহু প্রান্তে তৃণমূল নেতারা নিরুদ্দেশ, দলীয় কার্যালয় বন্ধ।
■ দল ছেড়ে  দলে দলে নেতা-কর্মীরা পাড়ি দিচ্ছে বিজেপিতে।
■ এবং দলের অভ্যন্তরে এখনও ছদ্ম-তৃণমূলিদেরই প্রাধান্য।
এততো সব কারনেই এবার আর তেমনভাবে হালে পানি পাচ্ছে না তৃণমূলের ২১ জুলাই। শহিদ দিবসের এই বাৎসরিক অনুষ্ঠানের আর বিশেষ দেরি নেই। কিন্তু বিগত যে কোনও বছরের তুলনায় এবার ২১ জুলাই নিয়ে তৃণমূলের প্রচারে ভাঁটার টান বেশ নজরে আসছে। সব মিলিয়ে এবারের ২১ জুলাই সেভাবে লোকজন হবে কিনা, তা নিয়ে গভীর উদ্বেগে তৃণমূলের সর্বোচ্চস্তর।
তৃণমূলের এই উদ্বেগ স্বাভাবিক। লোক আসবে কোথা থেকে? ধর্মতলার ভিক্টোরিয়া হাউসের সামনের ছোট জায়গা নিশ্চিতভাবেই ভরবে, কিন্তু গোটা শহর স্তব্ধ করে দেওয়ার মতো লোকজন এবার কারা যোগান দেবে ? লোকসভা ভোটের ফল বলছে, উত্তরবঙ্গে আজ তৃণমূল নিশ্চিহ্ন। অথচ উত্তরের জেলা থেকেই বিশাল লোকজন আসতো এই ২১ জুলাইয়ের সমাবেশে। গতবারের শহিদ দিবসে যারা তৃণমূল-সুপ্রিমোকে দেশের প্রধানমন্ত্রী বানানোর শপথ নিয়ে জেলায় ফিরেছিলেন,তাঁদের অধিকাংশই এখন বিজেপিতে। বারাকপুর শিল্পাঞ্চল এলাকায় দলের নেতা-কাউন্সিলরের সংখ্যাই এখন হাতে গোনা। যারা আছেন, সেই নেতাদেরও আজ লোকজন জড়ো করে মিছিল নিয়ে কলকাতায় আসার পরিস্থিতি নেই। দুই ২৪ পরগনা, হুগলি,নদিয়া, জঙ্গলমহলেও এক চিত্র। উপচে পড়া লোক তাহলে কোথা থেকে আসবে ?
ভোটের পর, কিছুদিন আগে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নৈহাটি পুরসভার সামনে বিজেপির বিরুদ্ধে ধরনা-বিক্ষোভে অংশ নিয়েছিলেন। মঞ্চের সামনে, দূরে, বাড়ির ছাদে-জানালায় থাকা সব লোক যোগ করলেও হাজার দু-তিনেকের বেশি হয়নি। তাও বাস-লরি করে লোক আনতে হয়েছিলো আশেপাশের জেলা থেকে। ভাবা যায়না। শেষ কবে মমতা এই স্বল্প জমায়েতে বক্তৃতা দিয়েছেন,তা গবেষণার বিষয়।
এবারের ২১ জুলাইয়ের ‘থিম’ ঠিক করে দিয়েছেন নেত্রী নিজেই। ২০১৮-তে থিম ছিলো “২০১৯, বিজেপি ফিনিশ’। ভোটের ফল এই স্লোগানের ভাগ্য নির্ধারন করে দিয়েছে। ২০১৯-এর স্লোগান বা দিম, “ইভিএম নয়, ভোট হোক ব্যালটে”। এই স্লোগানের ভবিষ্যত প্রশাসনিক দিক থেকে শূন্য। ইভিএমের বদলে কাগজের ব্যালট ফিরে আসার সম্ভাবনা যে নেই, তা ইতিমধ্যেই স্পষ্ট করে দিয়েছে নির্বাচন কমিশন। ফলে ইস্যুটি কতখানি দাগ ফেলতে পারবে, তা নিয়ে সন্দেহ আছে। অন্যান্যবার ২১ জুলাইয়ের অন্তত এক মাস আগে থেকে জেলায় জেলায় প্রস্তুতি বৈঠক শুরু হয়ে যায়। জেলায় জেলায় হয় সভা সমাবেশ। সেখানে ভাষণ দেন তৃণমূলের শীর্ষনেতারা। অথচ এবার তো সমাবেশের দোরগোড়া এসেও খাস কলকাতা শহরেই  সেভাবে একুশের পোস্টার, ফ্লেক্স নেই। মমতার ছবি দেওয়া হোর্ডিংয়ে পাড়ার অলিগলিও ভরে যেতে দেখা যেতো, কোথায় সে সব ? তৃণমূল শিবির কি একুশের-উৎসাহ এবা হারিয়ে ফেলেছে? সবারই সম্ভবত স্মরণে আছে, ২৩মে ফলপ্রকাশের পর প্রথমবার প্রকাশ্যে এসে সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছিলেন, দলের নেতাদের জেলায় জেলায় “জনসংযোগ যাত্রা” করতে হবে। যে সাধারণ মানুষ তৃণমূলের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে, তাদের ঘাসফুলের পতাকার তলায় ফেরাতে হবে। কিন্তু কোথায় সে সব? অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় ও শুভেন্দু অধিকারি বিক্ষিপ্তভাবে দু-একটি  “জনসংযোগ যাত্রা” করলেও বাকি সব হেভি-হেভিওয়েট নেতারা কোথায় গেলেন ?
সব মিলিয়ে ভিড় নিয়ে তৃণমূলের এই উদ্বেগ স্বাভাবিক। এটা হয়তো ঠিক, টেনেটুনে ৭০-৮০ হাজার লোক সেদিন শহরে এলেই ধর্মতলা ভরে যাবে। কিন্তু এই ২১জুলাই-ই তৃণমূলের ইউএসপি। সেই শহিদ দিবসের আগেই দলের এই কাছাখোলাভাব যেভাবে দেখা যাচ্ছে, তা ভবিষ্যতে নেত্রীর চিন্তা বাড়াবেই। সে সব তৃণমূল বোধহয় পরে ভাববে, এখন টার্গেট কোনওক্রমে ২১জুলাই ধর্মতলা উতরানো।
সেটা হয়তো সম্ভব হবে, কিন্তু সেই উপচে পড়া ভিড়ের ছবি যে দেখা যাবেনা, সে ব্যাপারে আজ তৃণমূল নেতারাই মোটামুটি নিশ্চিত।
Spread the love

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।