প্রথম পাতা

সাফল্য না এলেও লড়াইকে সম্মানজনক করে করতে চান বিপ্লব

নিজস্ব প্রতিনিধি— ১৯৮০ সাল থেকে ২০১৪, টানা ৩৪ বছর মেদিনীপুর লোকসভা আসন ছিল সিপিআইয়ের দখলে। প্রথমে নারায়ণ চৌবে, তারপরে ইন্দ্রজিৎ গুপ্ত, শেষে প্রবোধ পাণ্ডা এই আসন থেকে জয়ী হয়েই সংসদে পৌঁছেছেন। ৩৪ বছরের সেই স্বর্ণালি যুগের পতন ২০১৪ সালে। ১ লক্ষ ৮৪ হাজার ৬৬৬ ভোটে তৃণমূল কংগ্রেসের প্রার্থী সন্ধ্যা রায়ের কাছ হেরে যান সিপিআইয়ের প্রবোধ পাণ্ডা। ক্ষয় শুরু হয়েছিল ২০০৯ সাল থেকেই। ২০১৪ সালে সেই ক্ষয় থেমে যায়নি। পাঁচ বছর পর লোকসভা নির্বাচনে বাম ভোটের সেই ক্ষয় রোধ করে সম্মানজনক লড়াই দেওয়াটাই চ্যালেঞ্জ মেদিনীপুরের সিপিআই প্রার্থী বিপ্লব ভট্টের কাছে।

নাম ঘোষণা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই প্রচারে নেমে গিয়েছেন বাম কর্মী-সমর্থক। মেদিনীপুরের সাতটি বিধানসভা এলাকার প্রতিটিতেই রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছেন তারা। এই ক্ষয় রোধ কি সম্ভব হবে? খড়গপুরে সিপিআই পার্টি কার্যালয়ে বসে বিপ্লব ভট্ট বলেন, যে সব জায়গায় গিয়েছি, সাধারণ লোকের সঙ্গে কথা বলেছি, আমাদের সভা-মিছিলে লোকজন আগের তুলনায় বেড়েছে। পঞ্চায়েত নির্বাচনের সময় অনেক জায়গায় পৌঁছতে পারিনি। এরকমই একটি জায়গা কেশিয়াড়ির নছিপুর। এবারে সেখানে গিয়ে সভা করেছি। লোকজন জড়ো হয়েছেন। আমাদের কথা শুনেছেন। এই ট্রেন্ড কি অন্য জায়গাতেও দেখা যাচ্ছে? বিপ্লব বলেন, এটুকু বলতে পারি আগের থেকে ভালো সাড়া পাচ্ছি। এই সাড়াটুকুই আশা। বেসরকারি একটি সংস্থার হয়ে সমীক্ষার কাজ করছেন এক কর্মীর মুখেও শোনা গেল বিপ্লবের কথার প্রতিধ্বনি। পশ্চিম মেদিনীপুর, ঝাড়গ্রামে নীচুতলায় সিপিএম-সিপিআই ছেড়ে বহু কর্মী-সমর্থক বিজেপিতে নাম লিখিয়েছিলেন। মূলত নিরাপত্তা পাওয়ার জন্যই ছিল এই দলবদল। তাদের কেউ কেউ আবার পুরনো দলে ফিরছেন।

২০১৪ সালে প্রবোধ পাণ্ডার প্রাপ্ত ভোট ছিল ৩ লক্ষ ৯৫ হাজার ১৯৪। বিপ্লব ভালো করেই জানেন, এই ফিগারে পৌঁছনো অসম্ভব। কিন্তু লড়াইয়ে হাল ছাড়তে তিনি কোনও মতেই রাজি নন। বিপ্লবের পক্ষে আরেকটা আশার কথা, মূলত কৃষিপ্রধান গ্রামাঞ্চলপ্রধান এই লোকসভা এলাকায় বিরোধী দলের নীচুতলার কর্মীরা এখনও অবধি সন্ত্রাসের অভিযোগ তুলছেন না। বিপ্লবের বিশ্লেষণ, শাসক দল গোষ্ঠীদ্বন্দ্বে দীর্ণ। নির্বাচনের পর রাজনৈতিক পরিস্থিতি কী হবে তা নিয়ে সংশয়ে ভুগছেন তারা। তাই আগ বাড়িয়ে ঝামেলায় জড়াতে চাইছেন না তাঁরাও। গ্রামে বিরোধী কর্মী-সমর্থকদের ভয় কাটতে শুরু করার এটাও অন্যতম কারণ। এর জন্যই বাম ভোট আবার সংগঠিত হওয়ার কাজ শুরু হয়েছে। বিপ্লব স্বীকার করেন যে, আমার কথা সমর্থকদের নিরাপত্তা দিতে পারিনি। এখন তাদের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছি। এই কাজে বাম ঐক্য কতটা মজবুত? বিপ্লব বলেন, সিপিএম মনপ্রাণ লড়িয়ে প্রচারে নেমেছে। এ নিয়ে আমার কোনও অভিযোগ নেই।

বামেদের লড়াই তৃণমূল, বিজেপি দু’জনের সঙ্গেই। তাই মোদি আমলে কেন্দ্রীয় সংস্থাগুলির দুর্দশা কৃষকদের একের পর এক আত্মহত্যা তার বক্তব্যে উঠে আসছে। শ্রমিক আন্দোলন থেকে উঠে আসা সুবক্তা, সুদর্শন এই সিপিআই নেতা তাই বাম কর্মীদের নজর কাড়ছেন সহজেই।

মেদিনীপুর লোকসভা আসনে আরেকটি ফ্যাক্টর সংখ্যালঘু ভোট। ২০১৪ সালে বামেদের এই ভোট ব্যাঙ্কে বড়সড় থাবা বসিয়েছিলেন সন্ধ্যা রায়। এবারে ছবি বদলে গিয়েছে অনেকটাই। বিপ্লব বলেন, দাঁতন ২নং ব্লকে গিয়েছিলাম। ওখানে সংখ্যালঘু অধ্যুষিত ৬টি বুথ আছে। গত কয়েকটি ভোটে এরা তৃণমূলের দিকে ভোট দিয়েছিল। কিন্তু এবার ওখান থেকে বহু মানুষ আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। শাসক দলের গোষ্ঠী রাজনীতিতে এরা বীতশ্রদ্ধ। বিপ্লবের আশা, এই ট্রেন্ড দেখা যাবে নির্বাচনী এলাকার অন্য জায়গাতেও। এই রকম টুকরো টুকরো বদলের ছবিই সংঘটিত হয়ে উঠবে। সাফল্য না এলেও সেই পথ সন্ধানের লড়াইকে সম্মানজনক করে তুলবে, শ্রমিক নেতা বিপ্লব এবং তাঁর সহকর্মীদের এটাই আশা।

Spread the love

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।