জেলা

লাল-সাদা থেকে নীল-সাদা, এই পরিবর্তনও কি জরুরি ছিল?

নিজস্ব প্রতিনিধি— লালপাড় সাদা শাড়ি থেকে নীলপাড় সাদা শাড়ি।এই পরিবর্তনই এখন জোরদার আলোচনার বিষয়বস্তু হয়ে উঠেছে পূর্ব মেদিনীপুরে। শুরু হয়েছে অহিংস আন্দোলন। শেষ পর্যন্ত কে জেতে, কে হারে এখন সেটাই দেখার।

উল্লেখ্য, ব্রাহ্মসমাজের উদ্যোগে ১৯০৭ সালে পূর্ব মেদিনীপুর জেলার কাঁথি শহরে ব্রাহ্ম মেয়েদের পড়াশোনার জন্য তৈরি হয় চন্দ্রামণি ব্রাহ্ম বালিকা বিদ্যালয়। প্রথমে ব্রাহ্ম মেয়েরাই পড়াশোনার সুযোগ পেলেও পরে হিন্দু মেয়েদেরও সেই সুযোগ দেওয়া হয়। বর্তমানে এটি সরকার পরিচালিত স্কুল। পরিচালন সমিতি না-থাকায় প্রশাসক পদে রয়েছেন স্কুল ইনস্পেক্টর। প্রথম শ্রেণি থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত স্কুলের পোশাক ছিল সাদা ফ্রক ও লাল বেল্ট। নবম-দশম, একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণির জন্য লালপাড় দেওয়া সাদা শাড়ি। কিন্তু গত ২৬ জানুয়ারি থেকে সাদা ফ্রক বদলে হয় নীল স্কার্ট। লালপাড় সাদা শাড়ি বদলে হয় নীলপাড় সাদা শাড়ি। কিন্তু এই রঙ নিয়ে আপত্তি তুলেছেন স্কুলের প্রাক্তনীরা। স্কুলের এক প্রাক্তনীর কথায়, “আমরা চাই, আবার পুরোনো পোশাক ফিরে আসুক স্কুলে। কারণ ওই পোশাকের রঙের সঙ্গে স্কুলের ঐতিহ্য জড়িয়ে রয়েছে।’

লালপাড় সাদা শাড়ি থেকে একেবারেই নীলপাড় সাদা শাড়ি। পরিবর্তন এসেছে বিভিন্ন ক্ষেত্রে। কিন্তু শতবর্ষ পেরোনো একটি স্কুলে এই পরিবর্তন কি খুব জরুরি ছিল? এই প্রশ্নটাই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে প্রাক্তনী থেকে অন্যদের মধ্যেও। কারণ, ব্যতিক্রমী ভাবনার ফসলই এই ব্রহ্ম বালিকা বিদ্যালয়। সরকারি আর সব নিয়ম মেনে চলতে চায় এই স্কুলের সিংহভাগ। কিন্তু কেন এই পোশাকে রঙের পরিবর্তন তা তারা বুঝে উঠতে পারছেন না। সরকার যে চাপিয়ে দিয়েছে, এমন কথা বলছেন না কেউই। অনেক সময় অনেক ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখতে হয় অতীতের কৃষ্টি সংস্কৃতিকে ধরে রাখতে। সেখানে এই পরিবর্তন না করলেই হত। যদিও প্রধান শিক্ষিকা রীতা মাইতি রায়চৌধুরীর সাফাই, বর্তমান ছাত্রীদের অনেকের পোশাকের ধরন ও রং বদলের কথা বলেছিল। তাদের কথা মেনে ফ্রকের বদলে স্কার্ট ও লাল-সাদার বদলে নীল-সাদা করা হয়েছে। সাদা ফ্রকে মেয়েদের অনেক সমস্যা হয়। তবে রঙিন ফ্রকে সেই সমস্যা নেই। প্রধান শিক্ষিকা বলছেন ঠিকই, তবে এতদিন কি করে সম্ভব হল, সেই প্রশ্নও তুলছেন প্রাক্তনীরা।প্রধান শিক্ষিকার দাবি, গত বছর অগস্টে স্কুলের বৈঠকে পোশাক বদলের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। তিনি বলেন, “আমি একা কোনও সিদ্ধান্ত নিইনি। এই নিয়ে আলোচনার জন্য আমি সবসময় প্রস্তুত। কিছু প্রাক্তনী ফেসবুকে অনেক কিছু লিখছেন। ওখানে ঝগড়া করে কী লাভ? সমস্যা সমাধানের আশ্বাস দিয়েছেন স্কুলের প্রশাসক চিরঞ্জীব সাঁতরা| স্কুলের এক প্রাক্তন ছাত্রী বলেন, ‘ব্রাহ্ম গার্লসের মেয়ে বলতে সকলে লালপাড় সাদা শাড়ির মেয়েদের এক ডাকে চেনে। কিন্তু ওই পোশাকের রং বদলে দেওয়ায় ২৬ জানুয়ারির শোভাযাত্রায় আমাদের স্কুলের মেয়েদের আমরাই চিনতে পারিনি। ব্যানারে স্কুলের নাম না-থাকলে আমাদের স্কুলের মেয়ে বলে বুঝতেই পারতাম না।আর এক প্রাক্তনী বলেন, “কী ভাবে, কার সিদ্ধান্তে পোশাকের রং বদলে ফেলা হল, সেটাই বুঝতে পারছি না। তবে শুধু প্রাক্তনীরা নয়, যাঁর নামে এই স্কুল সেই চন্দ্রামণি মাইতির প্রপৌত্রী সুচেতা মাইতি চট্টোপাধ্যায়ও এইভাবে পোশাকের রং বদলে যাওয়া মন থেকে মেনে নিতে পারেননি। সেই কারণে প্রাক্তনীদের আন্দোলনের পাশে দাঁড়িয়েছেন তিনি|

লাল-সাদা থেকে হঠাৎ করে নীলসাদা। কাঁথির চন্দ্রামণি ব্রহ্ম বালিকা বিদ্যালয়ের ছাত্রীদের পোশাকের রং পরিবর্তনে শুরু হয়েছে বিতর্ক। ক্ষুব্ধ প্রাক্তনীরাও। সোশ্যাল মিডিয়ায় ইতিমধ্যে চাঁচাছোলা ভাষায় আক্রমণ করেছেন তাঁরা। অভিযোগ, কারও সঙ্গে আলোচনা না-করে পোশাকের রং বদলের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা। সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত ছাড়া শতবর্ষের একটি স্কুলে কী ভাবে পোশাকের রং বদল করা সম্ভব, প্রশ্ন উঠেছে বিভিন্ন মহলে। স্কুলের প্রাক্তনীদের বক্তব্য, কোনও স্কুলের ঐতিহ্যের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে। স্কুলের পোশাক। ফলে প্রাচীন কোনও স্কুলে এই ভাবে রাতারাতি পোশাকের রং বদলে ফেলা যায় না। ফের পুরোনো পোশাক ফিরিয়ে আনার দাবিও তুলেছেন তাঁরা।

স্কুলের প্রশাসক তথা বিদ্যালয় পরিদর্শক, মহকুমাশাসক ও স্থানীয় সাংসদের কাছে ইতিমধ্যে স্মারকলিপি জমা দিয়েছেন প্রাক্তনীরা। উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার পর সব পক্ষকে ডেকে আলোচনা করে সমস্যা সমাধানের। আশ্বাস দিয়েছেন প্রশাসনের কর্তারা।

Spread the love

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।