দেশ প্রথম পাতা

মোদি ১৫০টি সভা করলেও ১৫০ আসন প্রাপ্তি নিয়ে দোলাচল

রাজধানীতে বিজেপি’র হার নিয়ে জল্পনা তুঙ্গে

নিজস্ব প্রতিনিধি— মিশন শক্তির সাফল্যের গল্প বুধবার দেশবাসীকে শুনিয়েছেন মোদি। আর আজ বৃহস্পতিবার থেকে নির্বাচনী প্রচার শুরু করছেন প্রধানমন্ত্রী। দেশজুড়ে দেড়শোটি সভা করার কথা তাঁর। কিন্তু তাঁর দল কি পারবে দেড়শো আসনের অঙ্ক পেরোতে।কারণ, রাজনীতিতে সংখ্যাই শেষ কথা বলে। ফলে প্রত্যাবর্তন নাকি অন্য কিছু! আপাতত এই নিয়ে সরগরম দেশের রাজনীতি। কোনও সমীক্ষাই জোর দিয়ে বলতে পারছে না, ৭ রেসকোর্স রোডে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনে দেখা যাবে নরেন্দ্র দামোদর দাস মোদিকে। শুরু হয়েছে গণতন্ত্রের সর্ববৃহৎ উৎসব। আমজনতার ভোটের ওপর ভিত্তি করে শুরু হবে সরকার গড়ার পালা। কিন্তু ৫ বছর আগে যে সংখ্যাগরিষ্ঠতাকে সামনে রেখে দেশজুড়ে মোদির উত্থান হয়েছিল, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মোদির জনপ্রিয়তা বেশ কিছুটা তলানিতে তা মানুষ বুঝেছে। বুধবার মিশন শক্তির সফলতা ভারতবর্ষের মুকুটে নতুন পালক সংযোজন করেছে ঠিকই, কিন্তু গ্যাসের দাম, পেট্রোলের দাম ঊর্ধ্বমুখী হওয়ার আমজনতার নাভিশ্বাসও কোনও অংশে কম নয়। নোট বাতিল যে ক্ষত তৈরি করেছে মানুষের  মনে, সেই ক্ষতে মোদি আদৌ প্রলেপ দিতে পারল কিনা তা জানা যাবে ২৩ মে। সেই সঙ্গে ব্যবসায়ীদের ওপর জিএসটি চাপানোতে অনেকে কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। একদিকে আচ্ছে দিনের প্রতিশ্রুতি, ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে ১৫ ল‍ক্ষ টাকা দেওয়ার জুমলা, সেই সঙ্গে পাঠানকোট উরি এবং বালাকোটের অভিজ্ঞতা শেষ পর্যন্ত মোদিকে আদৌ কোনও ডিভিডেন্ড দেয় কিনা তা সময়ই বলবে। তবে তার আগে, দেশজুড়ে বিজেপি কি অবস্থায় দাঁড়িয়ে তা দেখে নেওয়া যাক। কারণ, এ বিজেপি মোদি-অমিত শাহদের তৈরি। যেখানে প্রতিষ্ঠাতা দুই সদস্যকে গত নির্বাচনে বিপুল ভোটে জয়ী হওয়া সত্ত্বেও কোণঠাসা করে দেওয়া হয়েছে। আদবানি, মুরলী মনোহর যোশী, বাজপেয়ীদের হাত ধরে যে বিজেপি’র উত্থান ঘটেছিল, বর্তমান সময়ে দাঁড়িয়ে কি অবস্থানে রয়েছে বিজেপি দেশ জুড়ে তার সামগ্রিক হদিশ পাওয়ার চেষ্টা হয়েছে এই প্রতিবেদনে।

রাজধানীর রাজনৈতিক মহল নিশ্চিত না! বস্তুত, কোন পাটিগণিতের অঙ্কে মোদি আর রেসকোর্স রোডে ফিরবেন না, তা নিয়ে আপাতত জোর জল্পনা চলছে দিল্লির বিভিন্ন মহলে| সেই পাটিগণিত খুব সরল এবং স্পষ্ট। প্রাথমিকভাবে যেমন বলা হচ্ছে, দেশের ৭টি রাজ্যে যে ১৯৩টি লোকসভা আসন আছে, তার মধ্যে খুব বেশি হলে মোদি ৫ থেকে ১০টি আসন জিততে পারেন। এই রাজ্যগুলি হল তামিলনাড়ু, কেরল, অন্ধপ্রদেশ, তেলেঙ্গানা, কর্ণাটক, ওডিশা এবং পশ্চিমবঙ্গ। কেন এই রাজ্যগুলি থেকে বড়জোর ১০টি (সবচেয়ে কম ৫টি) আসন পেতে পারেন বিজেপি?

এর ব্যাখ্যা হিসেবে বলা হচ্ছে, ২০১৪ সালে প্রবল মোদি-হাওয়ার মধ্যেও এই রাজ্যগুলির মোট ১৯৩টি আসনের মধ্যে মাত্র ২১টি আসন জিতেছিল বিজেপি। তার মধ্যে ১৭টি আসনই ছিল কর্ণাটকে। কিন্তু এবার কর্ণাটকের রাজনৈতিক সমীকরণ বদলে গেছে। সেখানে এবার কংগ্রেসের সঙ্গে দেবগৌড়ার জনতা দলের জোট হয়েছে। অঙ্ক বলছে, কর্ণাটকে এই দু’টি দলের মোট ভোটের পরিমাণ ৫৬ শতাংশ। এবার সেভাবে কোনও মোদি-হাওয়া নেই। পাশাপাশিই, যে ৭টি রাজ্যের কথা আলোচনা করা হচ্ছে, তার মধ্যে একমাত্র এডিএমকে-র সঙ্গে জোট গড়তে পেরেছে বিজেপি। বাকি কোথাও কোনও আঞ্চলিক দলের সঙ্গে তাদের জোট হয়নি। এডিএমকে-র সঙ্গে বিজেপি জোট গড়লেও এডিএমকে-ও আড়াআড়ি বিভক্ত এতটাই যে, তারা একটি আসনও না জিততে পারে। ফলে এই ১৯৩টি আসনে বিজেপি তথা মোদির ভরাডুবি এখনও পর্যন্ত অনিবার্য বলেই মনে করা হচ্ছে।

পাটিগণিতের পরের ধাপ উত্তরপ্রদেশ। ২০১৪ সালে সেখানে ৮০টি আসনের মধ্যে ৭১টিই জিতেছিল বিজেপি। কিন্তু ওয়াকিবহাল মহল মনে করিয়ে দিচ্ছে, তখন কোনও বিরোধী জোট হয়নি। সকলেই আলাদা আলাদা লড়েছিল। ফলে বিজেপি-বিরোধী ভোট ভেঙেচুরে ছত্রখান হয়ে গিয়েছিল। এবার প্রথমত, যোগী আদিত্যনাথ মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে এখনও পর্যন্ত খুব সফল, এমন কথা তাঁর অতি বড় সমর্থকও বলবেন না।দ্বিতীয়ত, এবার সমাজবাদী পার্টি, বহুজন সমাজ পার্টি এবং রাষ্ট্রীয় লোকদল জোট বেঁধেছে। যাদের মিলিত ভোটের পরিমাণ ৪৪ শতাংশ। ঘটনাচক্রে, ২০১৪ সালে উত্তরপ্রদেশে বিজেপি-র ভোট ছিল ৪২ শতাংশ। সেই হিসেবে এবার বিজেপি উত্তরপ্রদেশে ২০ থেকে ২৫টি আসনের বেশি পেতে পারে না বলেই রাজধানীর রাজনৈতিক মহলের বক্তব্য। বিশেষজ্ঞদের আরও অভিমত, ওই তিন বিরোধী দলের সঙ্গে কংগ্রেস যোগ দিলে মোদি উত্তরপ্রদেশে শুন্য হয়ে যেতে পারেন।

এছাড়া রয়েছে রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশ ও ছত্তিশগড়। ওই তিনটি রাজ্যে মোট লোকসভা আসন ৬০টি। তিনটি রাজ্যেই কয়েকমাস আগের বিধানসভা ভোটে কংগ্রেস জিতেছে। রাজধানীর জল্পনা, ওই তিনটি রাজ্যে মোদির আসন ৩০-ও পেরোবে না। এই অঙ্ক সত্যি হলে ১১টি রাজ্যের মোট ৩৩৩টি আসনের মধ্যে বিজেপি-র আসনসংখ্যা ৬৫-ও পেরোবে না। বাকি রইল ২০৭টি আসন। সরকার গড়তে গেলে ২৭২টি আসন পেতে হবে। ফলে বাকি ২০৭টি আসনের মধ্যে মোদি তথা বিজেপি-কে ২০৬টি আসন পেতে হবে, যা অসম্ভব। সামগ্রিকভাবে এই অঙ্ক বলছে, মোদি পেতে পারেন সর্বোচ্চ ১৩৫টি আসন। সর্বনিম্ন ৭০টি। এর সঙ্গেই যে বিষয় নিয়ে রাজধানীর রাজনৈতিক মহল আলোচনায় মশগুল, তা হল— ২০১৪ সাল থেকে গত পাঁচ বছরে যে ২৫টি রাজ্যে ভোট হয়েছে, তার মধ্যে ১৫টিতেই হেরেছেন মোদি। যার মধ্যে রয়েছে দিল্লি, পাঞ্জাব, কর্ণাটক, মধ্যপ্রদেশ, রাজস্থান, ছত্তিশগড়। নিজের রাজ্য গুজরাটে বিধানসভা ভোটে মাত্র ৭টি আসনের গরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করতে হয়েছে বিজেপি-কে। বিরোধীদের অভিযোগ, গোয়া এবং মণিপুরে বিজেপি রাজ্যপালের মারফত ক্ষমতা দখল করেছে। বস্তুত, ২০১৮ সালে ত্রিপুরা ছাড়া একটি রাজ্যেও জেতেনি বিজেপি। বাকি ৯টি রাজ্যেই বিধানসভা ভোটে হেরেছেন মোদি।

Spread the love

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।