প্রথম পাতা

মানসের প্রশ্নবাণে সরষেফুল কর্মীদের

অভিষেক রায়

‘আমি যখন রাজনৈতিক দলের কর্মী তখন কড়া কথা বলি। কিন্তু প্রার্থী হয়ে এত কড়া কথা বলা উচিত নয়। পায়ে মাথা ঠেকিয়ে প্রণাম করা উচিত। সেই জন্য নির্বাচনী সভায় আমি বক্তৃতা দিতে চাই না।’ বক্তা মানস ভুইয়া। সময় সোমবার সন্ধ্যা। স্থান খড়গপুর শহরের ২৫নং ওয়ার্ডে জেলার পূর্ত কর্মাধ্যক্ষ নির্মল ঘোষ আয়োজিত কর্মিসভা।

কর্মীদের সামনে কড়া হেডমাস্টারের ভূমিকায় কেন নামতে হল চিকিৎসক মানসরঞ্জন ভুঁইয়াকে? কারণ নিজের রাজনৈতিক জীবনে বহু নির্বাচন পার করে আসা মানসবাবুর মনে হয়েছে, খড়গপুর কম কথা বলুক, কাজ বেশি করুক। খড়গপুর মানুষের কাছে যাক। ভোট ভিক্ষা করুক। মানুষের কাছে তাদের আশীর্বাদ, সমর্থন প্রার্থনা করুক। নেতারা আরও বেশি হাঁটুন। বাড়ি বাড়ি যান। বকম বকম কম করে এক্কেবারে ভোটারদের বাড়ি গিয়ে তাদের হাত ধরুক, বয়স্কদের পা ছুঁয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্য আশীর্বাদ প্রার্থনা করুক।

৩৫টি ওয়ার্ডের মধ্যে ২৬জন কাউন্সিলর তৃণমূলের হয়েও কেন খড়্গপুরকে নিয়ে চিন্তা করতে হচ্ছে আলাদাভাবে, মেদিনীপুর লোকসভা আসনের তৃণমূল প্রার্থী মানসবাবু মনে করছেন সঠিক কথা তুলে ধরতে নেতারা ব্যর্থ হয়েছেন আর দ্বিতীয়ত, নেতাদের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব। এই দুর্বলতাই খড়গপুরে তৃণমূল প্রার্থীকে ২০১৬ সালে তৃতীয় স্থানে ঠেলে দিয়েছিল। এই দুর্বলতাই ২০১৯ সালে মানসবাবুকে চিন্তায় রেখেছে।

সোমবার সন্ধ্যায় মানসবাবুর প্রশ্নবাণের সামনে তাই কার্যত দিশেহারা মনে হয়েছে তৃণমূল নেতা ও কর্মীদের। মানসবাবু বলেন, ‘খড়গপুর আইআইটিতে মেডিকেল কলেজ হয়েছে। ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ এবং মেডিকেল কলেজের এই অভূতপূর্ব সংযুক্তি ভারতবর্ষে প্রথম। এই কাজ আমি করিয়েছি। তার জন্য ২১ বার দিল্লি যেতে হয়েছে। প্রণববাবুর পা ধরতে হয়েছে। মনমোহন সিংয়ের হাত ধরতে হয়েছে। কিন্তু এটা কেউ জানে না। আমার পার্টির লোকজনও জানে না। আমরা মানুষের কাছে বলতে পারিনি। প্রচার করতে পারিনি। আমরা অ্যাডভান্টেজ নিতে পারিনি।’

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় রেল হাসপাতালকে মেডিকেল কলেজ করার কথা ঘোষণা করে মঞ্জুরি দেওয়ার পরও তা বাস্তবায়িত হল না কেন তা নিয়ে দিলীপ ঘোষ বা বিজেপি নেতাদের আমরা প্রশ্ন করতে পারিনি কেন? এই দীনতা কেন? ২০১৬ থেকে ২০১৯ বিজেপির রাজ্য সভাপতি বিধায়ক থাকা সত্ত্বেও রেল ওয়ার্কশপের জন্য এক পয়সাও বিনিয়োগ হয়নি। কিন্তু এ নিয়ে তৃণমূলের ভূমিকা কী? কর্মী-নেতাদের কাছে মানসের প্রশ্ন, কেন ডিআরএম অফিসে ধরনা দেওয়া হয়নি? কেন রেল ইউনিয়নের সঙ্গে আলোচনা করে আমাদের দল এই ইস্যু নিয়ে সরব হয়নি? প্রার্থী হয়ে গিয়ে মানুষের কাছে কী বলব? আমায় দেখতে কার্তিকের মতো, নাক টিয়াপাখির মতো। আমাকে মানুষ ভোট দেবে? আপনারা কেন মুখ খুলতে পারছেন না? কেন মানুষের কাছে যাচ্ছেন না? মানসের আক্রমণাত্মক মেজাজের সামনে অসহায় দেখায় সাধারণ কর্মীদের।

খড়গপুর ভোটরাজনীতির চিত্র বলছে, গত বিধানসভা নির্বাচনে ৬২ হাজার ভোট পেয়ে বিজেপির দিলীপ ঘোষ জয়ী হন। বামেদের সমর্থনে কংগ্রেস পায় ৫৬ হাজার ভোট। তৃণমূল ৩৪ হাজার ভোট নিয়ে নেমে যায় তৃতীয় স্থানে। ২০১৫ সালে পুর নির্বাচনে তৃণমূলের প্রাপ্ত ভোট ছিল ৪৪ হাজার। তারা ছিল প্রথম স্থানে। হাজার দুয়েক কম ভোট পেয়ে কংগ্রেস ছিল দ্বিতীয় স্থানে। হাজার তিরিশেক ভোট নিয়ে বামেরা তৃতীয় এবং বিজেপি ২৮ হাজারের মতো ভোট নিয়ে চতুর্থ স্থানে ছিল। খুব পরিষ্কার বাম-কংগ্রেসের হাজার পনেরো-ষোলো ভোট এবং তৃণমূলের হাজার দশেক ভোটে পুষ্ট হয়ে বিজেপি’র উত্থান। মানসের ব্যাখ্যা, তৃণমূলের নিজস্ব দুর্বলতা এবং মতভেদের জন্য বিজেপি ২০১৬ সালে জয়ী হয়েছে। কিন্তু ২০১৬ পরবর্তী সময়ে অঙ্ক অনেক বদলেছে। রবি পাণ্ডেরা তৃণমূলে এসেছেন। তৃণমূল এবং রবি পাণ্ডে সহ অন্যান্য কংগ্রেস ছেড়ে আসা কাউন্সিলরদের ভোট এক জায়গায় এনে দিলীপ ঘোষের পক্ষে জয়ের ব্যবধান ধরে রাখা মুশকিল। মানসের আরও ব্যাখ্যা, এখানে যদি তৃণমূল হারে, ধরতে হবে তৃণমলিরাই হারিয়ে দিয়েছেন। এরপরই হুঙ্কার, আমি কোনও কথা শুনব না। হার হলে প্রত্যেক কাউন্সিলর এবং ওয়ার্ড ইনচার্জদের জবাবদিহি দিতে হবে। আমি কোনও কথা শুনব না।

ব্যবধান ঘোচাতে কংগ্রেসের ভোটের উপর যে মানস অনেকটাই নির্ভর করছেন, তার হদিশ মিলল অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদের গলায়। তিনি বলেন, চাচাজি নেই। তাকে প্রণাম, শ্রদ্ধা জানাই। তাঁর আশীর্বাদ সঙ্গে রয়েছে। কর্মীদের দাওয়াই, মানুষের কাছে গিয়ে বলুন, চাচাজি থাকলে সাম্প্রদায়িক শক্তিকে কখনওই জায়গা দিতেন না। সম্প্রীতি, দেশরক্ষা, দেশের সংবিধানকে বাঁচানোর এই লড়াইয়ে কোনও ছুঁতমার্গ নেই, যুদ্ধ, ভালবাসা এবং রাজনীতিতে সবই ন্যায্য।

মানস প্রত্যয়ী, খড়গপুরে ব্যবধান ঘোচানোর লড়াইয়ে ‘উই শ্যাল ওভারকাম’। সাত বিধানসভার লোকসভা আসনে খড়গপুরই যে মাথাব্যথার কারণ তা স্পষ্ট তার বক্তব্যে। নেতা-কর্মীদের দুর্বলতা খুঁজে তা চিহ্নিত করার চিকিৎসায়। নেতা-কর্মীদের ঝাঁঝালো প্রশ্নবাণে নাজেহাল করে তাদের মাঠে নামানোর চ্যালেঞ্জ মানস নিয়েছেন। শহর তৃণমূল সভাপতি রবিশঙ্কর পাণ্ডে বলেন, ‘মানসদার রাজনৈতিক ওজন আছে, এটাও একটা বড় ফ্যাক্টর হবে এবারের নির্বাচনে। কিন্তু নেতাদের এক টেবিলে বসানোর কাজটা কি সহজ হবে?’ মানসের কথায়, টেবিলে আলোচনার মাধ্যমেই জটিল সমস্যার সমাধান সম্ভব। পাণ্ডে বলেন, খড়গপুরে নেতৃত্বে মতবিরোধ থাকতে পারে, কিন্তু নির্বাচনী লড়াইয়ে দলীয় প্রার্থীকে জেতাতে সবাই মাঠে নেমেই লড়ছেন।

Spread the love

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।