প্রথম পাতা

মমতা একাই ৯০, মোদি-অমিত ৫০

দেবাশিস দাস

ভোটকে ঘিরে রাজনৈতিক উত্তাপ ক্রমশ বাড়ছে। এপ্রিল মাসের শুরুতেই এই উত্তাপ আরও বাড়বে। সাত দফায় নির্বাচন হচ্ছে এই রাজ্যে। আগামী ১১ এপ্রিল, বৃহস্পতিবার আলিপুরদুয়ার ও কোচবিহার লোকসভা কেন্দ্রে ভোট রয়েছে। ১৯ মে রবিবার রয়েছে শেষ দফার ভোট। মাঝে প্রায় দেড় মাস রাজ্য রাজনীতি সরগরম থাকবে এই ভোটকে কেন্দ্র করে। যতদূর জানা গিয়েছে, আগামী ২ এপ্রিল থেকে নির্বাচনী প্রচার শুরু করতে চলেছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। যদিও প্রাথমিকভাবে জানা গিয়েছিল, ২৫ মার্চ থেকে তিনি নির্বাচনী প্রচার শুরু করতে পারেন। প্রথমে জানা গিয়েছিল, ৪২টি লোকসভা কেন্দ্রে দু’টি করে তিনি জনসভা করবেন। কিন্তু পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ৮৪টি নয়, ৯০টি সভা করতে চলেছেন তৃণমূল সুপ্রিমো, এমনটাই জানা গিয়েছে। যে আসনগুলি তুলনামূলকভাবে ততটা শাসকদলের পক্ষে অনুকুল নয়, সেই আসনগুলিতে দুয়ের বেশি তিনি সভা করতে পারেন বলে জানা গিয়েছে। সেক্ষেত্রে পার্শ্ববর্তী দুটি লোকসভা কেন্দ্রকে একসঙ্গে নিয়েও তৃণমূল সুপ্রিমো প্রচারের দিনক্ষণ ঠিক হতে পারে। এছাড়াও শুভেন্দু অধিকারী, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় এবং রাজ্য মন্ত্রিসভার সদস্য এবং দলের অন্য শীর্ষ নেতারাও প্রচারে যাবেন। সেই সঙ্গে তারকা কারা কারা প্রচারে থাকবেন তারও তালিকা তৈরি করা হয়েছে। স্টার ক্যাম্পের কারা কারা থাকবেন, তাদের তালিকা ইতিমধ্যেই প্রস্তুত। কারণ, সেই তালিকা নির্বাচন কমিশনে জমা দিতে হয়। সেকারণেই এই তালিকা তৈরির ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। প্রতিদিন কমপক্ষে দুটি করে সভা করতে পারেন তৃণমূল সুপ্রিমো। সাত দফা ভোটের নির্ঘণ্ট অনুযায়ী প্রচারের দিনক্ষণ ঠিক করা হচ্ছে।

এদিকে, বসে নেই বিজেপিও। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে বাংলায় বেশিবার আনার জন্য দিল্লির বিজেপি’র শীর্ষস্তরে তদ্বির করছেন। বঙ্গ বিজেপি’র শীর্ষ নেতারা। কিন্তু, দেশজুড়ে নির্বাচনী প্রচারে প্রধানমন্ত্রীর ব্যস্ততা তুঙ্গে। সেকারণে কিভাবে প্রধানমন্ত্রীকে দিয়ে বাংলায় বেশি সভা করানো যায়, তাই নিয়ে আরএসএস এবং বিজেপি’র শীর্ষস্তরে জোরদার তৎপরতা শুরু হয়েছে। রবিবারই বিজেপি’র পক্ষ থেকে সাংবাদিক বৈঠক করে জানানো হয়েছে, আগামী ৩ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী প্রথমে সভা করবেন শিলিগুড়িতে, তারপর ব্রিগেডের সমাবেশে যোগ দেবেন। একই দিনে প্রধানমন্ত্রীকে দিয়ে দুটি সভা করতে চাইছে বিজেপি। সেজন্য উত্তরবঙ্গের আটটি জেলার বিজেপি’র শীর্ষ নেতাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এই সভা যাতে সফল হয়, তার জন্য প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করতে। প্রথমে জানা গিয়েছিল, প্রধানমন্ত্রী সাত দফার ভোটে সাতটি সভা করবেন। এখন খবর পাওয়া যাচ্ছে, প্রধানমন্ত্রীকে দিয়ে কমপক্ষে ১০ থেকে ১১টি সভা করানোর জন্য বঙ্গ বিজেপি’র শীর্ষ নেতারা আদা-জল খেয়ে মাঠে নেমেছেন। এ রাজ্যের জন্য বিজেপি’র পর্যবেক্ষক কৈলাস বিজয়বর্গীয় ও অরবিন্দ মেনন, মুকুল রায় এবং দিলীপ ঘোষরা এক হয়ে মাঠে নেমেছেন প্রধানমন্ত্রীকে বাংলায় বেশি করে প্রচারের কাজে ব্যবহার করার জন্য। শুধু এখানেই শেষ নয়, বিজেপি’র সর্বভারতীয় সভাপতি অমিত শাহকে দিয়ে ৩৫ থেকে ৩৯টি সভা করানোর জন্য কৌশল গ্রহণ করেছে বিজেপি। যদিও শেষ পর্যন্ত এতগুলি সভা অমিত শাহের পক্ষে এরাজ্যে করা সম্ভব হবে কিনা তা নিয়ে যথেষ্ট দোলাচল রয়েছে। সেই সঙ্গে বিজেপি’র অন্যান্য রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী, বিশেষ করে যোগী আদিত্যনাথকে প্রচারে বেশি করে চাইছেন এরাজ্যের গেরুয়া প্রার্থীরা। ইতিমধ্যে বিজেপি’র প্রার্থীরা এই নিয়ে দলের রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষ এবং মুকুল রায়ের কাছে তদ্বির করা শুরু করেছেন। যে আসনগুলি সবচেয়ে বেশি সম্ভাবনাময় তার তালিকা তৈরি করে বঙ্গ বিজেপি’র শীর্ষ নেতারা অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে হেভিওয়েট দিল্লির শীর্ষ বিজেপি’র নেতাদের দিয়ে সভা করতে চাইছে। এক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি তদ্বির হচ্ছে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে চেয়ে। পরের তালিকায় নিঃসন্দেহে রয়েছেন অমিত শাহ। তবে, ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রী বিপ্লব দেবের প্রতি আগ্রহ সে অর্থে নেই বললেই চলে। অনেকে আবার হেমামালিনী থেকে শুরু করে অন্যান্য অভিনেত্রীদের প্রচারে চাইছেন নিজের লোকসভা কেন্দ্রে। বাংলার আইনশৃঙ্খলা নিয়ে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী রাজনাথ সিং তুলোধনা করুক রাজ্য সরকারকে, এমন বার্তা দিয়েও রাজনাথকে প্রচারে চাইছেন অনেকে। তবে, এক্ষেত্রে উত্তরবঙ্গের আসনগুলিতে রাজনাথ সিংয়ের চাহিদা রয়েছে।

হেভিওয়েট নেতাদেরকে নিয়ে এসে নিজেদের আধিপত্য ধরে রাখতে মরিয়া কংগ্রেসও ইতিমধ্যে উত্তর মালদায় সভা করে গিয়েছেন কংগ্রেস সভাপতি রাহুল গান্ধি। ফের এই নেতাকে প্রচারে চেয়ে তদ্বিরও করা হয়েছে প্রদেশ কংগ্রেসের তরফে। ইতিমধ্যে এআইসিসি’র কাছে তদ্বির করে হেভিওয়েট নেতাদের পেতে তালিকা পাঠিয়েছেন প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি সোমেন মিত্র। এই তালিকায় রয়েছেন সোনিয়া গান্ধি, প্রিয়াঙ্কা গান্ধি, ছত্তিশগড়ের মুখ্যমন্ত্রী ভূপেশ বাঘেলা, পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী অমরেন্দ্র সিং, এছাড়া অশোক গেহলট, কমল নাথ, সলমন খুরশিদদের মতো নেতারা যাতে বেশি বেশি এরাজ্যে কংগ্রেসের প্রচারে আসেন তার জন্য এ রাজ্যের জন্য কংগ্রেসের পর্যবেক্ষক গৌরব গগৈ-এর সঙ্গে শলাপরামর্শ করে এআইসিসি’র কাছে তালিকা পাঠিয়েছেন প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি। যে চারটি আসন কংগ্রেসের দখলে রয়েছে, সেই চারটি আসনে প্রিয়াঙ্কা এবং সোনিয়ার মধ্যে যে কোনও একজন পাওয়ার জন্য মরিয়া প্রয়াস লক্ষ্য করা গিয়েছে কংগ্রেসের মধ্যে।

বামেরা অবশ্য এরাজ্যের শীর্ষ নেতাদের ওপরই ভরসা রাখছেন। সীতারাম ইয়েচুরি ছাড়া সূর্যকান্ত মিশ্র, বিমান বসুরা বামেদের ‘স্টার ক্যাম্পেনার’। সেই সঙ্গে সুশীল সমাজের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের শামিল করানোর চেষ্টা করছে বামেরা। কানাহাইয়া কুমার, তিনি এবার নিজেই বেগুসরাই থেকে প্রার্থী। ফলে তাঁকে আনার চেষ্টা চললেও আদৌ তাকে পাওয়া যাবে কিনা তা নিয়ে যথেষ্ট ধোঁয়াশা রয়েছে। ফলে স্থানীয় বুথ-ভিত্তিক নেতাদের ওপরেই ভরসা রেখে নিজেদের জমি ফিরে পাওয়ার জন্য মরিয়া বামেরা। সম্প্রতি সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক সূর্যকান্ত মিশ্র বলেছেন, বামেরা সবাই ভালো করবে। যদিও দুটি লোকসভা কেন্দ্র দক্ষিণ মালদা ও বহরমপুরে বামেরা শেষ পর্যন্ত প্রার্থী দিচ্ছে না। এপ্রসঙ্গে সূর্যকান্ত মিশ্র জানিয়েছেন, বিজেপি এবং তৃণমূল বিরোধী ভোট যাতে ভাগ না হয়ে যায়, তার জন্য এই কৌশল নেওয়া হয়েছে। এই দুটি আসনে বামেদের জয়ী হওয়ার সম্ভাবনা ছিল না, সেকারণেই এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে।

আগামী ২৩ মে লোকসভা নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণা হবে। এরাজ্যের চারটি বড় রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতারা প্রত্যেকেই দাবি করছেন, তাদের ফল ভালো হবে। তৃণমূল কংগ্রেসের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এবার ৪২-এ ৪২ হবে। বিজেপি’র দাবি ২২ থেকে ২৩টি আসন এবার তাদের দখলে আসবে। কংগ্রেস এবং বামেরা তাদের আসন ধরে রাখতে মরিয়া। ফলে, শেষ পর্যন্ত যেই ভালো ফল করুক না কেন, আগামী দেড় মাস নির্বাচনী প্রচারকে ঘিরে সরগরম থাকবে রাজ্য রাজনীতি তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

Spread the love

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।