জেলা প্রথম পাতা

বিশ্ব নারী দিবসে মহিলাদের পাশে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান

নিজস্ব প্রতিনিধি : রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে বিশ্ব নারী দিবস উদযাপন  অনুষ্ঠানে আয়োজন করা হয়। জেলায় বিশ্ব নারী দিবসে নারী সম্মান জানাতে এগিয়ে এলো বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। এদিন সকাল থেকে সারাদিন ধরে জেলার বিভিন্ন প্রান্তে বিশ্ব নারী দিবস উদযাপন করা হয়।বিশ্ব নারী দিবসে উদ্বাস্তু পরিবার ও গ্রামীণ মহিলাদের আর্থিক ক্ষমতায়নে গুরুত্ব দিতে নানা ধরনের কর্মসূচি নিল হলদিয়ার বিভিন্ন শিল্প সংস্থা ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলি। এদিন সকালে বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী সংস্থা হলদিয়া এনার্জি লিমিটেডের উদ্যোগে উদ্বাস্তু পরিবারের স্বনির্ভর গোষ্ঠীর মহিলাদের নিয়ে দুর্গাচকে নারী দিবসের সচেতনতামূলক পদযাত্রার আয়োজন করা হয়।ক্ষুদিরাম স্কয়ার থেকে শুরু হয় পদযাত্রা। দুর্গাচক টাউন পরিক্রমা করেন স্বনির্ভর গোষ্ঠীর কয়েকশো মহিলা। শিল্প সংস্থার উদ্যোগে এদিন দুর্গাচকে আলোচনাসভার আয়োজন করা হয়। উপস্থিত ছিলেন হলদিয়ার মহকুমাশাসক কুহুক ভূষণ, সুতাহাটা পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি আনজুমা বিবি, সংস্থার মহিলা ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের নেত্রী তপতী চৌধুরি প্রমুখ। এদিন হলদিয়া অভ্যুদয় সংস্থার উদ্যোগে গ্রামীণ মহিলাদের স্বশক্তিকরণের জন্য ‘ভিলেজ মার্কেটিং’ প্রকল্পের সূচনা হয়। সংস্থার কর্মকর্তা প্রণব বেরা বলেন, গ্রামে মহিলাদের স্যানিটারি ন্যাপকিন ব্যবহারে সচেতনতা বাড়ানো এবং অল্প মূল্যে তা বিক্রির জন্য বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। স্বনির্ভর গোষ্ঠীর মহিলারাই এগুলি তৈরি করে বাড়ি বাড়ি বিক্রি করবেন আগামীদিনে। বাজারের স্যানিটারি ন্যাপকিনের অর্ধেক মূল্যে এগুলি বাড়ি বাড়ি গিয়ে বিক্রি করবেন স্বনির্ভর গোষ্ঠীর মহিলারাই। এক একটি প্যাকেটের দাম ১৮টাকা। এদিন ২০জন স্বনির্ভর গোষ্ঠীর মহিলার হাতে বিনামূল্যে ২০০টি করে প্যাকেট তুলে দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, হলদিয়ার ‘ফ্রি উইংস‘ নামে মহিলাদের দ্বারা পরিচালিত একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার উদ্যোগে এদিন সিটি সেন্টারের উৎসব ভবনে ‘মেনস্ট্রয়াল হাইজিন’ নিয়ে দিনভর আলোচনা ও হাতেনাতে ন্যাপকিন তৈরির প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। সংস্থার নেত্রী সাগরিকা দত্ত বলেন, পুরসভার বস্তি ও গ্রামীণ এলাকায় সামান্য খরচে স্যানিটারি ন্যাপকিন তুলে দিতেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সংস্থার মহিলারা বাড়ির কাজে পর এই কাজ করবেন। 

শিল্প শহরের পাশাপাশি  তিন নারীকে সাম্মাননা কেউ দারিদ্রের সঙ্গে লড়াই করে সংসারের হাল ধরেছেন, কেউ শিক্ষকতার সঙ্গেই চালিয়ে গিয়েছেন সাহিত্য সাধনা-এমনই তিন নারীকে আজ আন্তর্জাতিক নারী দিবসে কুমুদিনী ডাকুয়া সম্মাননা করলেন। অনুষ্ঠান শুরু হয় প্রদীপ প্রজ্জ্বলনের মধ্য দিয়ে। আজকের দিনে নারীদের নিয়ে বিভিন্ন নাচ, গান এবং আবৃত্তির মাধ্যমে দিনটি পালন করা হয়।

প্রতিবছরের মতো আজও নিমতৌড়ী তমলুক উন্নয়ন সমিতি নীরাদের সম্মাননা জানিয়ে আসছেন। তিন নারী পারবিন বেগম, প্রণতি রায় এবং পুষ্প সাঁতরা কে কুমুদিনী ডাকুয়া নামঙ্কিত সম্মাননা তুলে দেওয়া হয়। পাবিন এবং প্রণতির লড়াইটা দৈনন্দিন জীবনে। সংসারের চাকা ঘোরাতে তারা হাল ধরেছেন। তমলুকের চনশ্বরপুর এলাকার বড়বড়িয়া গ্রামের বাসিন্দা পেশায় কাঠের মিস্ত্রি মহম্মদ মাইমুদের সঙ্গে। তাঁদের চার সন্তান। সকলেই শ্রবন সংক্রান্ত প্রতিবন্ধী।

প্রতিবন্ধী ছেলেমেয়ের পড়াশোনার ব্যবস্থা করতে দিশেহারা হয়েছিল পারবিনের পরিবার। সংসার চালাতে স্বামী ভিনরাজ্যের কাজে চলে যান। ২০০৩ সালে পারবিন ছেলেমেয়েদের পড়াশোনার জন্য নিমতৌড়ী তমলুক উন্নয়ন সমিতির স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাতে সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ করেন। ওই স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার সাহায্যে তাঁর এক মাধুরীর চিকিৎসা হয়েছে। তাতে সে একটাই সুস্থ। ওই সংস্থার পরিচালিত স্কুলের হেস্টেলে থেকে পড়াশোনা করে বাকি তিন সন্তান মাধ্যমিক পাশ করেছে। বছর পঁতাল্লিশের পারভিন বর্তমানে ওই সংস্থার নৈশ প্রহরীর কাজে যুক্ত। কিডনির অসুখে আক্রান্ত স্বামী চিকিৎসার পাশাপাশি আপাতত পরিবারের হাল ধরেছেন পারবিন।

পারবিন পালস্ পোলিও অভিযানের প্রতিবন্ধকতাযুক্ত ব্যক্তিদের সাহায্যের কাজে যুক্ত। প্রতিদিন বাড়ী থেকে কয়েক কিলো মিটার দুরে কর্মস্থলে যাতায়াত করা পারবিন বলেন ছেলেমেয়েদের নিয়ে প্রথম দিকে মানসিক ভাবে ভেঙে পড়েছিলাম তবে হাল ছাড়িনি। এখন ছেলেমেয়েদের সাফল্য আমার সাফল্য।

আবার নন্দকুমারের টোটাবেড়িয়ার গ্রামের বাসিন্দা প্রণতি রায়। চার মেয়ে ও এক ছেলেকে নিয়ে সংসার চালাতে হিমশিম খেতেন প্রণতির মা। বড়ো প্রণতি উচ্চমাধ্যমিক পাশের পর চাকরির আসায় বেসিক ট্রেনিং করেছিলেন সংসার দায়িত্ব থেকে সরে যাননি। দুই বোন ও ছোটো ভাইয়ের পড়ো শোনার দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন। তাদের বিয়ে দিয়েছেন। বর্তমানের এলাকার বাসিন্দাদের চিকিৎসায় সাহায্য করা ছাড়াও প্রতিবেশীদের রেশনকার্ড, বি.পি.এল, শিশু মহিলাদের উন্নয়ন ও বিকাশে শুধুনয় নানান সচেতনতামূলক প্রচার অভিযানে নিজেকে ও অন্যকে সামিল করতে এগিয়ে চলেছেন দায়িত্ব ও কর্তব্যপরায়ন প্রনতী রায় আর এখন তিনি সকলের দিদি। দিদি ডাকে শান্তিপান, দিশাখুঁজে পান, জীবনের সব স্বাদ আহ্লাদ খুঁজে পান – তার সুখ-স্বাচ্ছন্দের এক অন্য জীবন আমাদের কাছে আদর্শ ।

অন্যদিকে পাঁশকুড়া থানার আটবেড়িয়া গ্রামের বাসিন্দা পুষ্প সাঁতরা প্রাথমিক স্কুলে শিক্ষকতা করতেন। পাশাপাশি সাহিত্য চর্চ্চা করেন দীর্ঘদিন ধরে । বর্তমানে শিক্ষকতা থেকে অবসর নিলেও সাহিত্য চর্চ্চা চলেছেন সমান তালে। নিজের সাহিত্য প্রত্রিকা প্রকাশ করা ছাড়াও পাঁচটি বই প্রকাশ করেছেন। পেয়েছেন নানা পুরস্কার। 

এই তিন মহিলার লড়াই এবং সাহিত্য চর্চ্চাকে কুর্ণিশ জানানো হয়েছে আজ। নিমতৌড়ী তমলুক উন্নয়ন সমিতির সাধারণ সম্পাদক যোগেশ সামন্ত বলেন, দারিদ্র্য এবং নানা প্রতিবন্ধকতার সঙ্গে লড়াই করে এই তিন নারী আজ সফল। আমাদের সকলের কাছে অনুপ্রেরণা। আন্তর্জাতিক নারী দিবসে এঁদের সম্মান জানাতে পেরে আমারও গর্বিত।

 

Spread the love

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।