Uncategorized

প্রতিপক্ষকে টেক্কা দিতে ফোনে নয়, বিশেষ সফটওয়্যারে কথা বলবেন নেতারা

আনা হচ্ছে নির্বাচনী অ্যাপসও

দেবাশিস দাস

মস্তিষ্ক দিয়ে প্রতিপক্ষের দুর্গে আঘাত হানতে হবে। ফলে কৌশলেও বদল আনতে হতে পারে যেকোনও মুহূর্তে। কিন্তু প্রতিপক্ষ যদি রণকৌশল আগাম আঁচ করে নেয়, তাহলে ভেস্তে যেতে পারে যাবতীয় পরিকল্পনা। মাঠে মারা যেতে পারে সব প্রয়াস। সেকারণে প্রযুক্তির সাহায্য নিচ্ছেন এরাজ্যের রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতাদের সিংহভাগ অংশ। তবে, সে প্রযুক্তির ব্যবহার তারা কিভাবে করছেন, সেবিষয়ে শাসক কিংবা বিরোধী কোনও দলই মুখ খুলতে নারাজ। তবে, প্রকাশ্যে সংবাদমাধ্যমের সামনে বিবৃতি না দিলেও কৌশল যে অবলম্বন করা হয়েছে তা অবশ্য ঘনিষ্ঠ মহলে স্বীকার করে নিয়েছেন তাঁদের অনেকেই। ফেসবুক, টুইটার, হোয়াটসঅ্যাপ, মেসেজ, লাইভ চ্যাট এগুলিতো রয়েছে, গোপন তথ্য আদান-প্রদানের ক্ষেত্রে ফোন নম্বর খুব একটা কার্যকর ভূমিকা নিতে পারছে না। কারণ, ফোনে তথ্য বিনিময় হলে তা নাকি কোনও না কোনও ভাবে প্রতিপক্ষের কাছে ফাঁস হয়ে যাওয়ার ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। শুধু ফাস হয়ে যাওয়াই নয়, অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে দেখা গিয়েছে, গোপন তথ্য কোনও না কোনও ভাবে প্রতিপক্ষের কাছে চলে গিয়েছে। ফলে, নির্বাচনের দিনগুলিতে বিশেষ সফটওয়্যার মোবাইলে ডাউনলোড করে তার মাধ্যমে বার্তা বিনিময় করছেন এরাজ্যের শীর্ষ নেতাদের একাংশ। শাসক ও বিরোধী দুই পক্ষের অনেক নেতাই সফটওয়্যারের মাধ্যমে নিজেদের মধ্যে কথা চালাচালি করছেন বলে বিশ্বস্ত সূত্রে খবর। যদিও কারও ফোনে আড়িপাতা নিয়মনীতি অনুযায়ী সম্ভব নয়। যদি একান্তই আড়ি পাততে হয় তার জন্য প্রয়োজনীয় অনুমতি নিতে হয়। কিন্তু নিয়ম থাকলেও এর ফাঁক বের করে প্রতিপক্ষের গোপন কৌশল যাতে বের করে নেওয়া যায় তার জন্যই মরিয়া অনেকে। সেকারণে বিশেষ এই সফটওয়্যার ডাউনলোড করা হয়েছে। যদিও এরাজ্যের শাসকদলের কোনও নেতাই এই নিয়ে প্রতিক্রিয়া দিতে রাজি হননি। তবে, এই সফটওয়্যার ব্যবহার ব্যক্তিগত ক্ষেত্রে যেকেউ করলেও যাঁদের সঙ্গে ভোট

চলাকালীন নিয়মিত কথা বলা জরুরি, তারা সবাই একই ধরনের সফটওয়্যার ডাউনলোড করেছেন বলে জানা গিয়েছে। এক্ষেত্রে বামেরা ও কংগ্রেস যথেষ্টই পিছিয়ে রয়েছে। তবে, বিজেপি’র নেতারা এই সফটওয়্যার ব্যবহারে অনেক এগিয়ে। কারণ, তারাই এরাজ্যের প্রধান বিরোধী দল। যতদূর জানা গিয়েছে, বিজেপি’র বেশ কয়েকজন শীর্ষ নেতা যাঁরা এতটা টেকস্যাভি ছিলেন না তাঁদের কয়েকজনকে প্রযুক্তি নিয়ে যারা কাজ করেন, তারা প্রশিক্ষণ দিয়েছেন বলে জানা যাচ্ছে। কারণ, রাজ্য গোয়েন্দাদের একাংশ নজরদারি করছে। বিজেপি’র শীর্ষ নেতাদেরকে, এমনটাই অভিযোগ করেছেন বঙ্গ বিজেপি’র কয়েকজন শীর্ষ নেতা। দিল্লি থেকে কলকাতা, এমনকি জেলায় তারা কোথাও গেলে তাদেরকে অনুসরণ করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করছেন বঙ্গ বিজেপি’র শীর্ষ নেতাদের দু-একজন। যদিও রাজ্য গোয়েন্দা দফতরের থেকে এধরনের অভিযোগের সারবত্তা নেই বলে জানানো হচ্ছে। তবে একথায় আশ্বস্ত হতে পারছেন না বিরোধী শিবিরের নেতারা। সেকারণে ঘন ঘন কৌশল বদলাচ্ছেন বিজেপি’র শীর্ষ নেতারা। নির্বাচনের আগে এতদিন যে সফটওয়্যারের মাধ্যমে দিল্লির শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে বঙ্গ বিজেপি’র দু-একজন নেতা যোগাযোগ রাখছিলেন, আপাতত সেই সফটওয়্যার বাতিল করে দিয়ে নতুন সফটওয়্যার ভোটের মুখে মোবাইলে ডাউনলোড করা হয়েছে বলে খবর পাওয়া গিয়েছে। তবে, গাণিতিক সভ্যতার এই আধুনিক যুগে দিল্লি কংগ্রেসের শীর্ষ নেতারা এধরনের সফটওয়্যার অ্যাপসকে কাজে লাগিয়ে দ্রুত নিজেদের মধ্যে বার্তা বিনিময় করতে অনেক আগে থেকেই সক্ষম হলেও এক্ষেত্রে অনেক পিছিয়ে প্রদেশ কংগ্রেস। দু-একজন প্রদেশ কংগ্রেসের শীর্ষ নেতা এই ধরনের অ্যাপস এবং সফটওয়্যারকে কাজে লাগানোর ক্ষেত্রে প্রথমের দিকে গুরুত্ব দিয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে নিজেদের ব্যক্তিগত গোপন কথাবার্তার কাজে এই সফটওয়্যার বা অ্যাপস ব্যবহার করছেন, যা দলীয় নেতাদের সঙ্গে পারস্পরিক তথ্য আদানপ্রদানের ক্ষেত্রে খুব একটা কাজে লাগছে না। সেই সঙ্গে নির্বাচনকে সামনে রেখে তৃণমূল কংগ্রেসের যেমন ওয়্যাররুম থাকছে একইভাবে বাম ও কংগ্রেসের থিঙ্কট্যাঙ্ক এই রাজ্যের জন্য বিশেষভাবে তৈরি হয়েছে। যারা প্রতিদিনকার তথ্য সংগ্রহ করে শীর্ষ নেতাদের অবহিত করবেন এবং কমিশনের কাছে বিভিন্ন অভাব-অভিযোগ দ্রুত জানিয়ে সংবাদমাধ্যমের দৃষ্টিতে নিয়ে আসবে। এনিয়ে বিজেপি’র যেমন নির্দিষ্ট সেল রয়েছে, ঠিক তেমনই ভাবে কংগ্রেস ও সিপিএম’ও এই পথ ধরে এগোচ্ছে। বামেরা একটি আলাদা অ্যাপস তৈরি করেছে গোপনে। এই অ্যাপসের মাধ্যমে রাজ্যের মানুষের কাছে পৌছে যেতে চাইছে। রাজ্যের বেশ কয়েকটি স্পর্শকাতর লোকসভায় বুথভিত্তিক মানুষের কাছে বামেরা পৌছতে পারবে না জেনে ভোটের সময় দলের রণকৌশল পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে। অ্যাপসের মাধ্যমে। যাঁরা সমমনোভাবাপন্ন হবেন তারা এই ধরনের বার্তা পরবর্তী ক্ষেত্রে আরও বেশি করে পাওয়ার জন্য অ্যাপসটি ডাউনলোড করবেন। যদি দেখা যায়, তিনি এই অ্যাপসটি ব্যবহার করছেন, তাহলে দলীয়ভাবে জানার চেষ্টা হবে তিনি এলাকায় বামপন্থী রাজনীতিতে বিশ্বাসী কিনা, সেই খবর পাওয়ার পর তাকে দলের যে কৌশল তা অ্যাপসের মাধ্যমেই পাঠানো হবে। তবে, এক্ষেত্রে যিনি অ্যাপসটি ডাউনলোড করছেন তার কাছে প্রথমেই জানতে চাওয়া হচ্ছে তার ঠিকানা, মোবাইল নম্বর, মেল আইডি সহ সাদামাটা কিছু তথ্য। কারণ, এমনও হতে পারে তিনি বামপন্থী নন, কিন্তু তিনি এই অ্যাপসটি ডাউনলোড করছেন, তাহলে পুরো গোপন তথ্য ভোটযুদ্ধ জয়ের রণকৌশল বাইরে চলে আসবে। এক্ষেত্রে সমীক্ষা করে দেখে নেওয়া হচ্ছে, ওই মানুষটির ব্যাকগ্রাউন্ড। যদি তিনি বামপন্থী নাও হন, অথচ তৃণমূল কংগ্রেস ও বিজেপি’র বিরোধী তাহলে তাকে বাম আদর্শে উদ্বুদ্ধ করারও চেষ্টা করা হচ্ছে এই অ্যাপসটির মাধ্যমে। ফলে, পাড়া-বৈঠক না করেও সমমনোভাবাপন্ন মানুষের জোট গড়ে তুলে এরাজ্যের বিজেপি ও তৃণমূলকে পরাস্ত করার জন্য প্রযুক্তিকে ব্যবহার করা হচ্ছে বামেদের তরফে। তবে পুরো বিষয়টি টপ-সিক্রেট।

এদিকে, স্মার্ট ফোন রয়েছে রাজ্যের সিংহভাগ মানুষের কাছে। বসে নেই তৃণমূলও। ফ্যামগ্রুপকে সামনে রেখে রাজ্যের আমজনতার কাছে ৪২টি লোকসভা কেন্দ্রে তৃণমূল প্রার্থীদের জয়ী করার আহ্বান জানিয়ে জোরদার প্রচার চলছে। ৪২টি লোকসভার প্রতিটির জন্য অনেক আগে থেকেই একটি করে পেজ খুলেছে তৃণমূল। নির্বাচন যত সামনে এগিয়ে আসবে লোকসভা ভিত্তিক ফেসবুক, টুইটারেও ঝড় তুলবে তৃণমূল। তার পাশাপাশি স্মার্টফোন ব্যবহারকারীদের কাছে বার্তা যাবে তৃণমূলের তরফে। সবমিলিয়ে লোকসভা নির্বাচনকে ঘিরে মাঠে-ময়দানে প্রচারের পাশাপাশি এবার প্রযুক্তির ব্যবহার অন্যান্য বারের নির্বাচনের তুলনায় সবচেয়ে বেশি হবে বলে মনে করা হচ্ছে। তরুণ প্রজন্মের ভোটারদের মন পাওয়ার জন্য বিভিন্ন আকর্ষণীয় ক্যাপশন তৈরি করা হচ্ছে। এই ক্যাপশনগুলি হবে খুবই বুদ্ধিদীপ্ত, যা আপনি চাইলেও এড়িয়ে যেতে পারবেন না। আপনাকে এগুলি স্মার্টফোনে খুলে দেখতে বাধ্য করা হবে। এরজন্য বহুজাতিক বিজ্ঞাপন সংস্থারও দ্বারস্থ হতে চলেছেন রাজনৈতিক দলগুলি। আসলে ইভিএমের লড়াই আর শুধু মাঠে-ময়দানের মধ্যে লোক সংগ্রহের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না, তা পরিণত হতে চলেছে মস্তিষ্কযুদ্ধে। সেই সঙ্গে হেভিওয়েট নেতারা যখন প্রচার করবেন বিভিন্ন লোকসভায়, তার আগে এই সভাকে অন্য মাত্রায় নিয়ে যাওয়ার জন্য হাইটেক প্রচার শুরু হয়ে যাবে সোশ্যাল মিডিয়ায়। সেই সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ আকর্ষণীয় বক্তব্যগুলি পরবর্তী সময়ে সর্বসাধারণের জন্য ইউটিউবে ডাউনলোড করে দেওয়া হবে, যাতে করে অল্প সময়ের মধ্যে মোদি-মমতা কি বললেন তা জেনে যাবে তরুণ প্রজন্ম।

Spread the love

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।