প্রথম পাতা

দিদি হয়ে ওঠার লড়াইয়ে নিজের ভাবমূর্তি মেরামতের দায়িত্ব ভারতীকেই নিতে হবে: দিলীপ

ফোন ট্যাপের অভিযোগ ভারতীর

তাঁর ফোন ট্যাপ করা হচ্ছে। নির্বাচন কমিশনের কাছে অভিযোগ জানালেন ঘাটালে বিজেপি প্রার্থী ভারতী ঘোষ। সোমবার হকপুর মনসা মন্দিরে পুজো দিয়ে ভারতী বলেন, সিআইডি তার ফোন ট্যাপ করছে। তিনি আইনজীবীর সঙ্গে কথা বলে কমিশনে অভিযোগ জানিয়েছেন।

নিজস্ব প্রতিনিধি— ডেবরার বেসরকারি লজের সরু বারান্দায় দাঁড়িয়ে খড়গপুর ২নং ব্লকের কালিয়াড়া ১নং অঞ্চলের পুরনো বিজেপি কর্মী বিশ্বনাথ ধল। একটু আগেই শেষ হয়েছে ঘাটাল লোকসভা আসনের কর্মী সম্মেলন। প্রারম্ভিক বক্তব্যের পর মণ্ডলভিত্তিক নেতাদের সঙ্গে সাংগঠনিক আলোচনা হয়েছে। কী আলোচনা হয়েছে, জানতে চাইতেই বিশ্বনাথ বললেন, ম্যাডাম প্রাথমিক কিছু আলোচনা করেছেন। কিছু জিনিস জানতে চেয়েছেন। দিলীপদাও ছিলেন। ঘাটাল লোকসভা আসনে বিজেপি প্রার্থী পশ্চিম মেদিনীপুরের প্রাক্তন পুলিশসুপার ভারতী ঘোষের লড়াই ঠিক এই জায়গাটাতেই। ম্যাডাম থেকে দিদি হওয়ার লড়াই। সোমবার ডেবরার কর্মী সম্মেলনেও সাধারণ বিজেপি কর্মীদের সঙ্গে প্রার্থীর এই সম্ভ্রমের দুরত্বটাই সামনে এসেছে। ভারতী নিজেও তা জানেন। তাই কর্মিসভায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে বলেছেন, মানুষের সঙ্গে মিলেমিশে কাজ করতে এসেছি। আমি এখন এক বৃহৎ পরিবারের সদস্য। আমাদের মাথার উপরে আছেন দিলীপদা। যখনই সমস্যায় পড়বেন আমাকে ফোন করবেন। আপনাদের পরিবারের রেশন কার্ডে আমার নাম যোগ করবেন।

দূরত্ব মেটানোর প্রথম ধাপ হিসেবে দলীয় কর্মীদের সঙ্গে বসেই ভাত, আলুভাজা, বেগুনভাজা, ঘ্যাঁট, আলু-পোস্ত, রুই মাছের কালিয়া, চাটনি, পাঁপড়, দই-মিষ্টি দিয়ে মধ্যাহ্নের আহার সারলেন ‘ম্যাডাম’। হাল ফ্যাশনের লং কুর্তা আর জিনসের প্যান্টে পাশের বাড়ির মেয়ে হয়ে ওঠার এই লড়াইয়ের বৃত্ত সম্পূর্ণ করার জন্য জকপুরের মঈশা গ্রামে মা মনসার থানে পুজো দেওয়ার পরে দলীয় কর্মীদের সঙ্গে একই স্বরে বললেন, জয় শ্রীরাম, জয় বজরংবলী কি জয়, জয় মা মনসার জয়। কিন্তু দিদি হয়ে ওঠার এই লড়াই ভোট ময়দানে কি প্রভাব ফেলবে? জকপুরে মনসা মায়ের থানে দাঁড়িয়ে স্থানীয় গ্রামবাসী বেলা ধক জানালেন, উনি আগেও কয়েকবার এসেছিলেন। সাধারণত দুপুরের দিকেই আসতেন। ওনাকে ভোট দেবেন? কোন পার্টি থেকে দাঁড়িয়েছেন জানতে চাইলেন মহিলা। ‘পদ্মফুল। ভোট দেবেন?’ মিচকি হেসে বেলাদেবীর জবাব, না, ভোট ঘাসফুলকেই দেব। তৃণমূল আমাকে প্রতিবন্ধী ভাতা করে দিয়েছে। দিদি হয়ে ওঠার এই লড়াইয়ে ভারতীর আরেক প্রতিবন্ধকতা তাঁর ইমেজ। রাজ্য সভাপতি দিলীপ ভারতীর হয়ে ব্যাট ধরে বলেন, উনি সরকারি আধিকারিক ছিলেন। সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগ করতে গিয়ে ওনার বিরুদ্ধেও অভিযোগ করা হয়েছে। আগে উনি সামনে ছিলেন। এখন পাশে এসেছেন। দিলীপ বলেন, ওনার বিরুদ্ধে কোনও অভিযোগ থাকলে ভারতীদেবীই সেই অভিযোগের উত্তর দিয়ে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করবেন। পরিষ্কার, দিদি হয়ে ওঠার লড়াইয়ে নিজের ভাবমূর্তি মেরামতের দায়িত্ব ভারতীকেই নিতে হবে।

এদিনের কর্মী সম্মেলনে উঠে আসে বিজেপি’র অভ্যন্তরীণ গোষ্ঠী লড়াইয়ের কথা। ভারতী বলেন, কেউ রাগ করে ঘরে বসে থাকবে। সেই সুযোগ আমি কাউকে দেব না। প্রত্যেক কর্মীকে কাজে লাগাব। তাদের সঙ্গে থাকব। ঘাটাল সাংগঠনিক জেলা বর্তমান ও প্রাক্তন সভাপতির মধ্যে দ্বন্দ্ব আছে। সেই দ্বন্দ্ব মেটাতে ভারতী নিজে উদ্যোগী হবেন বলে বিরোধী গোষ্ঠীর নেতা রতন দত্তকে জানিয়ে দিয়েছেন। রতন জানিয়েছেন, সাংবিধানিক জেলা নেতৃত্ব দায়িত্ব না দিলেও তারা প্রার্থীর অনুরোধে প্রার্থীর হয়ে প্রচারে নামবেন। এদিন সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ভারতী বলেন, তিনি ঘাটালে জিতবেন। মানুষ তৃণমূলকে জবাব দেবেন। তৃণমূল রাজনৈতিকভাবে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে দেউলিয়া হয়ে গিয়েছে। তিনি জিতলে সর্বতোভাবে ৩৬৫ দিন কাজ করবেন ঘাটালের মানুষের জন্য। ভারতী বলেন, মানুষের কাছে ভোট চাইব। মানুষ ভালবেসে ভোট দেবে। প্রাক্তন এসপি’র কটাক্ষ, সুপার স্পেশালিটি হাসপাতালে গেলেই রোগীকে রেফার করে দেওয়া হয়, চাকরির জন্য এসএসসি পরীক্ষার্থীরা রাস্তায় বসেছেন, অনশন করছেন। গালাগালি দিয়ে তৃণমূল নিজেদের দেউলিয়াপনাই সামনে আনছে। এসপি হিসাবে তার ভাবমূর্তির জন্য মানুষের কাছে গেলে পচা ডিম ছুঁড়বে মানুষ, তৃণমূল জেলা সভাপতি অজিত মাইতির এই বক্তব্য প্রসঙ্গে ভারতী বলেন, এদের কথার জবাব দেওয়া অর্থহীন। মানুষ এদের জবাব দেবেন। ভারতীর মন্তব্য প্রসঙ্গে জেলা তৃণমূল সভাপতি অজিত মাইতি বলেন, ফাটকা খেলার জন্য বিজেপি ওকে প্রার্থী করেছে। দলের পুরনো কর্মীরা বিরক্ত। এরা প্রার্থীর বিরোধিতা করার জন্য মাঠে নেমে পড়েছেন। মনসা মন্দিরে মায়ের আশীর্বাদ ভিক্ষা প্রসঙ্গে অজিতবাবুর প্রতিক্রিয়া, ঠাকুরের বিবেচনাবোধ আছে। কে খারাপ, কে ভালো, তিনি ভালোই বোঝেন। এসপি হিসাবে তৈরি হওয়া ভাবমূর্তিই ভারতীকে সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়াতে দেবে না, এটাই মনে করছে দল। এটাই ভারতীর কাছে চ্যালেঞ্জ। মমতাকে ‘জঙ্গলমহলের মা’ সম্বোধন প্রসঙ্গে ভারতীর প্রতিক্রিয়া, কৈকেয়ীও মা ছিল। এই প্রশ্ন আজকের দিনে অর্থহীন। দেব প্রসঙ্গে বলেন, ভালো ছেলে। আমার ভাইয়ের মতো। এটা রাজনৈতিক মোকাবিলা। এই পাড়াই রাজনৈতিক ময়দানেই সীমাবদ্ধ রাখব। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারকে সুযোগসন্ধানী সরকার বলে ভারতী বলেন, তৃণমূল যখন যাকে দরকার তাকে ব্যবহার করে। বাংলার রাজনৈতিক রণক্ষেত্রে মানুষ এবারে জবাব দেবেন। কিন্তু সেই লড়াইয়ে অংশীদার সাফল্যের মুখ দেখতে বড় বাধা যে ভারতীর নিজের ম্যাডাম থেকে দিদি হওয়ার লড়াই, তা মেনে নিচ্ছে ভারতীর রাজনৈতিক পরিবার, বিজেপিও।

Spread the love

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।