কলকাতা প্রথম পাতা

তৃণমূলের ভোটবাক্সে সার্জিকাল স্ট্রাইক চায় বিজেপি

দেবাশিস দাস

লক্ষ্য একটাই৷ ৪২-এ ৪২। টার্গেট বেঁধে দিয়েছেন দলের সুপ্রিমো। ফলে দলীয় নেতাদের হোমটাস্ক সবার জানা। বীরভূমের অনুব্রত, উত্তর ২৪ পরগনার জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক, পূর্ব মেদিনীপুরের শিশির অধিকারী, পশ্চিম মেদিনীপুরের অজিত মাইতি এঁদের মধ্যে অনেক অমিল থাকলেও, এঁদের মধ্যে সবচেয়ে বড় মিল নির্বাচনকে সামনে রেখে যুদ্ধ জয়ের অঙ্কের মন্তব্যে। তবে শুধু এরাইনন, রাজ্যের ২৩টি জেলার শাসকদলের জেলা সভাপতিদের সবারই এক সুর, প্রতি বুথে জিততে হবে। অনেকে আবার শুধু জয় নয়, অনেক বেশি ভোটের ব্যবধানে লিড দিতে হবে দলীয় প্রার্থীকে, এমন কথাও বলছে। সব মিলিয়ে আগামী তিনমাস রাজ্যের প্রতিটি বুথের দিকে নজর থাকছে শাসক-বিরোধী নেতাদের, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। প্রতি বুথের রাজনৈতিক মানচিত্র কেমন তা ইতিমধ্যে শাসকদলের শীর্ষ নেতারা চুলচেরা বিশ্লেষণ করে নিয়েছে। প্রথমে জেলা পরিষদ ধরে ধরে, তারপর পঞ্চায়েত সমিতি, পরবর্তী সময়ে বুথস্তরে রাজনৈতিক বিন্যাস কেমন তা নিয়ে পর্যালোচনা হয়েছে শাসকদলের দলীয় স্তরে। প্রতিটি জেলার জেলা সভাপতির সঙ্গে আলাদা আলাদা করে ভবানীপুরের দলীয় কার্যালয়ে বৈঠক করেছেন সুব্রত বক্সি একাধিকবার। সেই সঙ্গে রাজ্যের বিভিন্ন জেলার যাঁরা পর্যবেক্ষক রয়েছেন তাদের ওপর বাড়তি দায়িত্ব রয়েছে সেই লোকসভার রক্ষণাবেক্ষণ করা, যাতে করে লোকসভা নির্বাচনে দল ফ্রন্টফুটে থাকে। ঝাড়গ্রাম জেলার পর্যবেক্ষক পার্থ চট্টোপাধ্যায় নিজের বাড়িতে গত দু’মাস ধরে এই লোকসভার ব্লকস্তরের নেতাদের নিয়ে বেশ কয়েকবার বৈঠক করেছেন। সেই সঙ্গে তিনি নিয়মিত ঝাড়গ্রামে যাচ্ছেন। পুরুলিয়াতেও তৃণমূল স্তরে নেমে কাজ করছেন শাসক নেতারা। পঞ্চায়েত ভোটের ড্যামেজ কন্ট্রোল করতে মরিয়া তৃণমূলের নেতা-মন্ত্রীরা মাটি কামড়ে পড়ে রয়েছেন। সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় তিনি পুরুলিয়া জেলার পর্যবেক্ষক। বাঁকুড়া জেলারও পর্যবেক্ষকের দায়িত্বে রয়েছেন অভিষেক। এই দুই জেলায় তৃণমূলের আধিপত্য অব্যাহত রাখতে বুথস্তর পর্যন্ত সাংগঠনিক শক্তি বৃদ্ধির ওপর জোর দিয়েছে তৃণমূল।

এদিকে, হাওড়া জেলায়ও জেলা সভাপতি তথা সমবায় মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস, মন্ত্রী রাজীব বন্দ্যোপাধ্যায় এবং অন্যান্য শাসকদলের জনপ্রতিনিধিরা নিজেদের মতো করে ভোটব্যাঙ্ক বাড়াতে ধারাবাহিকভাবে কর্মসূচি গ্রহণ করছেন। হুগলি জেলার শাসকদলের জেলা সভাপতি তপন দাশগুপ্ত, মন্ত্রী অসীমা পাত্র, বিধায়ক প্রবীর ঘোষালরাও বিধানসভা ধরে ধরে দলীয় কর্মসূচিতে অংশ নিচ্ছেন। উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা শেষ হয়ে গেলে মাইক ব্যবহার করা যাবে, প্রচারে গতি আসবে। সেকথা মাথায় রেখে কোন ব্লকে কারা কারা সভা করবেন তার জন্য ইতিমধ্যে প্রচার তালিকার কাজ শুরু হয়েছে। কারণ, বেশিদিন সময় পাওয়া যাবে না। সেকারণে যত বেশি জায়গায় নেতারা প্রচারে যেতে পারবেন ততই দলের স্বার্থে মঙ্গল হবে, সেকথা মাথায় রেখে এখন থেকেই হোমওয়ার্কে নেমে পড়েছে শাসকদলের শীর্ষ নেতারা। শুভেন্দু অধিকারী বেশ কয়েকটি জেলার পর্যবেক্ষক। ফলে ভোটের দিনক্ষণ ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে আগামী একমাস তার কি কাজ হবে, কোথায় কি সভা করবেন, সেই হোমওয়ার্কও সারা বলে জানা যাচ্ছে। বিভিন্ন সময় দেখা গিয়েছে, পঞ্চায়েত কিংবা পুরভোটে দলের যখন কেউ প্রার্থী হচ্ছেন, তিনি বিপুল ভোটে জয়ী হচ্ছেন। কিন্তু পরবর্তী সময়ে বিধানসভা কিংবা লোকসভা নির্বাচনে দেখা যায় যে পরিমাণ ভোট দলীয় প্রার্থীর পাওয়া উচিত ছিল তা বেশ কয়েকটি জায়গায় কমে গিয়েছে, এমনটা কিন্তু হওয়ার কথা ছিল না। বেশ কিছু ক্ষেত্রে স্থানীয় স্তরের নেতা এবং জনপ্রতিনিধিদের গা-ছাড়া মনোভাব এই জন্যই দায়ী। কারণ, সেই প্রার্থীর ভোট হয়ে গিয়েছে, ফলে দায়বদ্ধতা আর আগের মতো নেই। এধরনের মানসিকতা স্থানীয় নেতাদের আর বরদাস্ত করবে না তৃণমূল বলে সাফ জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। যিনি বিধায়ক হয়েছেন, তার দায়িত্ব বিধানসভা কেন্দ্রে লিড দেওয়া। যিনি পঞ্চায়েতে দায়িত্বে আছেন তিনি সেই দিকটা সামলাবেন। যিনি ব্লকে রয়েছেন তিনি ব্লক দেখবেন। জেলা পরিষদে যিনি জয়ী হয়েছেন তিনি জেলা পরিষদ ক্ষেত্র দেখবেন। পুরসভা থেকে যিনি কাউন্সিলর হয়েছেন তাকে তার ওয়ার্ডে দলীয় প্রার্থী যাতে বেশি সংখ্যক ভোটে জয়ী হতে পারেন। সে বিষয়টি দেখতে হবে। পারফরমেন্সই শেষ কথা। কারণ, পারফরমেন্স না করলে দল তাকে আগামীতে সুযোগ থাকলেও সেই সুযোগ দেবে না। অন্য যিনি প্রতিদ্বন্দ্বী দলীয় প্রত্যাশী রয়েছেন, তাঁকে সুযোগ করে দেওয়া হবে— এই ফর্মুলাকে সামনে রেখে আসন্ন লোকসভা নির্বাচনে ৪২টি লোকসভা আসনে জয় চাইছে তৃণমূল। রাজ্যের শাসকদলের এক শীর্ষ নেতার কথায়, দু-একটি আসন ছাড়া বাকি আসনগুলির রাজনৈতিক মানচিত্র তৃণমূলের পক্ষেই রয়েছে। দলীয় নেতারা ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করলে সহজ জয় এমনিতেই আসবে। বাকি দু-একটি আসন এখনও বিরোধীরা একটুখানি এগিয়ে থাকলেও ভোট যত সামনে আসবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রচারে নামলে সেগুলিও হয়ে যাবে। ঠিক এই কৌশলকে সামনে রেখেই আগামী দিনে শাসকদলের ভোটবাক্সে বসন্ত চায় তৃণমূল।

একের পৃষ্ঠার পর অন্যদিকে নির্বাচনের প্রস্তুতি যে জোরকদমে শুরু হয়ে গিয়েছে তা রণকৌশলের ইঙ্গিতেই স্পষ্ট। রবিবার তারই অঙ্গ হিসেবে তৃণমূল ভবনে সাংবাদিক বৈঠকে ১২ সদস্যের কমিটি ঘোষণা করলেন তৃণমূল কংগ্রেসের মহাসচিব পার্থ চট্টোপাধ্যায়। এই কমিটিতে রয়েছেন দলের রাজ্য সভাপতি সুব্রত বক্সি, পার্থ চট্টোপাধ্যায়, সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়, মন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী, চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য, ফিরহাদ হাকিম, অরূপ বিশ্বাস, মলয় ঘটক, শশী পাঁজা, সুব্রত মুখোপাধ্যায়, জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক ও ডেরেক ও’ব্রায়েন। আগামী দিনে ১২ জনের এই কমিটির কি কাজ হবে তা অবশ্য খোলসা করে বলেননি তৃণমূল কংগ্রেসের মহাসচিব। তবে, প্রার্থী বাছাই থেকে শুরু করে প্রচার কৌশল, সেই সঙ্গে ভোটের যাবতীয় কাজ তৃণমূলের এই একডজন নেতাকে সামনে রেখেই যে হবে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নির্দেশে এই কমিটি। খুব শীঘ্রই শাসকদলের এই এক ডজন নেতা দলীয় বৈঠকে বসবেন বলে খবর। কারণ, লোকসভা নির্বাচনের দিনক্ষণ ঘোষণা হয়ে গেলে সবাই ব্যস্ত হয়ে যাবেন। এই ১২ জনের কমিটিতে যারা রয়েছে তাদের মধ্যে ২০১৪ সোকসভা নির্বাচনে প্রার্থী হয়েছিলেন সুব্রত বক্সি, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। তৃণমূলের অনেক শীর্ষ নেতাই এবারও ভোটে লড়বেন। ফলে তাদের ওপর বাড়তি দায়িত্ব থাকবে। স্বাভাবিকভাবে সেকথা মাথায় রেখে তৃণমূল আসন্ন লোকসভা নির্বাচনের রণকৌশল ঠিক করছে। এদিকে বসে নেই বিজেপিও। ভারতীয় সেনার সাফল্যকে মূলধন করে দেশজুড়ে বিজেপি নিজেদের আধিপত্য বিস্তারের কৌশল নিয়েছে। সেকারণে সেনার সাফল্যকে বুথস্তরে নিয়ে যাওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে বিজেপি। সেই সঙ্গে বিজেপির বাইক মিছিলে জাতীয় পতাকাও দেখা যাচ্ছে। দেশপ্রেমের আবেগকে সামনে রেখে বুথস্তরে জয় চায় বিজেপি। আগামী লোকসভা নির্বাচনে যে রণকৌশল গ্রহণ করেছে বিজেপি তার মধ্যে অন্যতম এই কৌশল বলে জানা যাচ্ছে। কিন্তু এই আঁচ কতদিন ধরে রাখা যাবে এবং শেষ পর্যন্ত তা ভোটবাক্সে বসন্ত আনতে পারবে কিনা তা নিয়ে দোলাচল রয়েছে বিজেপির শীর্ষ নেতাদের মধ্যে। কারণ, সেনার সাফল্য বিজেপির সাফল্য বলে আদৌ মানবে কিনা আমজনতা তা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় রয়েছে। অন্যদিকে, সেনার সাফল্যের পিছনে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং তার দলের নেতামন্ত্রীরা যেভাবে ভাগ বসাতে চাইছে তা নিয়ে কটাক্ষের সুর আসছে কেন্দ্র-বিরোধী দলগুলির শীর্ষ নেতাদের মন্তব্যে। বিভিন্ন যুক্তি এবং চুলচেরা বিশ্লেষণকে সামনে রেখে কেন্দ্রবিরোধী নেতারা মোদি সরকারকে ফালা ফালা করছে। যদিও বিজেপি তা নিয়ে পিছু হঠতে রাজি নয়। কারণ, মোদির ছবিকে সামনে রেখে বিশাল বিশাল হোর্ডিং, পোস্টার পড়ছে। বিজেপি’র এই অভিনব প্রচার আসলে আসন্ন লোকসভা নির্বাচন নামক যুদ্ধ জয়ের জন্যই তা বলার অপেক্ষা রাখে না। এই হোর্ডিং, পোস্টার, কার্টআউটে সার্জিক্যাল স্ট্রাইক-২’র জন্য প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে অভিনন্দন জানানো হয়েছে। আগামী মাসতিনেক এই দেশপ্রেমের আবেগকে সামনে রেখে বিজেপি বুথস্তরে তাদের প্রার্থীকে জয়ী করার আহ্বান জানাবে, এমনটাই জানা গিয়েছে বঙ্গ বিজেপি’র নেতাদের মন্তব্যে। বিভিন্ন সময় দেখা গিয়েছে বিজেপি নেতারা নিজেদের বাড়িতে জাতীয় পতাকা তুলছে। দেশপ্রেমের ক্ষেত্রে তারা অনেক এগিয়ে, এমনটাই মানুষকে বোঝাতে চাইছেন নেতারা। শুধু দেশপ্রেম দিয়ে কাজ হবে না বুঝতে পেরে যেসব জায়গায় বিজেপি-বিরোধী দলগুলি ক্ষমতায় রয়েছে সেইসব রাজ্যের সরকারের ব্যর্থতাকে বিশেষভাবে তুলে ধরে প্রচারকে হাইটেক করতে চায় বিজেপি, যাতে করে অন্য দল সঠিকভাবে কাউন্টার করতে না পারে। এ রাজ্যের ক্ষেত্রেও বিভিন্ন চমক দিতে চাইছে বিজেপি। তৃণমূল কংগ্রেসের ঘর ভাঙার জন্য আদাজল খেয়ে নেমেছিলেন বঙ্গ বিজেপি’র কয়েকজন শীর্ষ নেতা। কিন্তু বড় কোনও নেতাকে বিজেপি’তে শামিল করতে না পেরে এবার বুথস্তরে তৃণমূলের বসে যাওয়া নেতাদের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়ানোর ওপর বিশেষ গুরুত্ব আগেই আরোপ করা হয়েছিল, এবার তা আরও জোরদার করা হচ্ছে বলে জানা গিয়েছে। প্রতি বুথে শাসকদলকে কিভাবে রুখে দেওয়া যায় তার জন্য খুব গোপনে ছক কষা হচ্ছে। বাম-কংগ্রেসও আসন সমঝোতা নিয়ে চূড়ান্ত পর্যায়ের বৈঠকে ব্যস্ত। ভোটের দিনক্ষণ ঘোষণা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাম কংগ্রেস সম্পর্ক শেষ পর্যন্ত কোন জায়গায় গিয়ে পৌছল তার একটি চিত্র সামনে আসার সম্ভাবনা প্রবল হয়ে উঠবে। তবে, নিজেদের ভোটব্যাঙ্ক অটুট রেখে শাসকদলকে কিভাবে রোখা যায় তার লোকসভা ভিত্তিক সমীক্ষা চলছে এই দলের মধ্যে। বামেরা যখন নিজেদের সংগঠনের ওপর বিশেষ আস্থা রাখছে, ঠিক সেই সময় প্রার্থী তালিকায় পরিচিত মুখকে সামনে নিয়ে এসে কংগ্রেস নিজেদের আধিপত্য কায়েম করতে চায়। সব মিলিয়ে লোকসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক উত্তাপ ক্রমশ বাড়ছে।

Spread the love

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।