জেলা প্রথম পাতা

জিততেই হবে বার্তা মমতার

দেবাশিস দাস

লোকসভা নির্বাচনকে ঘিরে উত্তাপ ক্রমশ বাড়ছে। হাতে সময় বেশি নেই। সেকারণে জঙ্গলমহলের লোকসভাগুলিতে উন্নয়নের কাজকর্ম কেমন হয়েছে। তার তদারকি চলছে নবান্ন থেকে। কারণ, এর মধ্যে চিফ মিনিস্টার্স প্রোজেক্ট রয়েছে। সেগুলির হালহকিকৎ মনিটরিং হচ্ছে নবান্ন থেকে। যেকোনও দিন নির্বাচন ঘোষণা হতে পারে। তবে তার আগে বৃহস্পতিবার কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার বৈঠকের পর ঝাড়গ্রাম লোকসভা নিয়ে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নবান্নে বিশেষ বৈঠক করেন। এই বৈঠকে রাজ্য মন্ত্রিসভার গুরুত্বপূর্ণ সদস্য পার্থ চট্টোপাধ্যায়, পরিবহণ ও পরিবেশ মন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী, ঝাড়গ্রাম বিধানসভার বিধায়ক ডা. সুকুমার হাঁসদা, নয়াগ্রামের বিধায়ক দুলাল মুর্মু, গোপীবল্লভপুরের বিধায়ক চূড়ামণি মাহাত, বিনপুরের বিধায়ক খগেন মুর্মু উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে ঝাড়গ্রাম লোকসভার উন্নয়ন নিয়ে বিশদে আলোচনা হয়েছে। প্রত্যাশার চেয়ে জঙ্গলমহলের প্রাপ্তি অনেক বেশি। এবার প্রতিদানের পালা। ভোটবাক্সে ২০১৪ সালের মতো বসন্ত এনে তৃণমূলকে জয়যুক্ত করবে আমজনতা, এমনটাই মনে করছেন শাসকদলের শীর্ষ নেতারা। তবে, সারা বছর ভোটের রাজনীতি না করে বিপদে-আপদে মানুষের পাশে থাকার যে কৌশল তৃণমূল নেতৃত্বাধীন সরকার গ্রহণ করেছে তার ফল আসন্ন লোকসভাতে প্রতিফলিত হবে তৃণমূল প্রার্থীদের জয়যুক্ত করার মাধ্যমে, এমন রিপোর্টই পাচ্ছে নবান্ন। পঞ্চায়েত নির্বাচনের ফলাফলে জঙ্গলমহলের কোথাও কোথাও শাসকদলের আশানুরূপ ফল হয়নি। প্রত্যাশার চেয়ে কিছুটা কম হয়েছিল। কারণ, পঞ্চায়েতে নেতাদের একাংশ নিজেদের পকেটের লোককে টিকিট পাইয়ে দেওয়ায় কিছুটা ক্ষোভের সঞ্চার হয়েছিল। সেই সঙ্গে ছিল স্থানীয় ইস্যু। যদিও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং তার নেতৃত্বাধীন সরকারের জনপ্রিয়তা কোনও অংশে কমেনি। তারই ফলস্বরূপ পঞ্চায়েত নির্বাচনের পর যাঁরা ক্ষুব্ধ হয়ে তৃণমূলের থেকে সরে গিয়েছিলেন, তাদের সিংহভাগ অংশই ঘরে ফিরেছেন। অটুট রয়েছে তৃণমূলের দুর্গ। আসন্ন লোকসভা নির্বাচনে জঙ্গলমহলে ২০১৪-এর ভোটব্যাঙ্কের চেয়ে তৃণমূলের ভোট বাড়বে বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহলের একাংশ। তবে, যেটুকু ত্রুটিবিচ্যুতি ঘটেছে তার অনেকটাই শুধরে নিয়েছে শাসকদল। আসন্ন লোকসভায় সেকারণে জঙ্গলমহলে তৃণমূলের ফলাফল কেমন হয় তা নিয়ে। রাজনৈতিক মহলে আলোচনা শুরু হয়েছে। প্রতিটি বুথে তৃণমূল যাতে জয়ী হতে পারে তার চেষ্টার কোনও খামতি রাখেনি শাসকদল। একদিকে উন্নয়ন, অন্যদিকে জঙ্গলমহলের চিরস্থায়ী শান্তিতে পরিণত করতে তৃণমূলের প্রতি যাতে আমজনতা আস্থা রাখে সেই বার্তাও দেওয়া হয়েছে। কারণ সমমনোভাবাপন্ন জনপ্রতিনিধিরা বুথস্তর থেকে শুরু করে লোকসভা পর্যন্ত না থাকলে উন্নয়নের ব্যাঘাত ঘটতে পারে। সেকারণে জঙ্গলমহলের সাধারণ মানুষের উন্নয়নকে আরও প্রসারিত করতে এই এলাকার সব লোকসভা আসনগুলিকেই ২০১৪-এর মতো পাখির চোখ করে এগোতে চাইছে তৃণমূল। সেকারণেই কোনও অজুহাত নয়, জিততেই হবে এই মানসিকতা নিয়ে চলার কথা বলা হয়েছে। তবে, তা হবে গণতান্ত্রিক পদ্ধতির মাধ্যমে।

সেই সঙ্গে আগামীতে ঝাড়গ্রাম লোকসভায় কোন কোন ইস্যুগুলিকে সামনে রেখে বিরোধীরা অপপ্রচার করছে তা নিয়েও আলোচনা হয়। জঙ্গলমহলের উন্নয়ন এবং শান্তি এসেছে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন সরকারের হাত ধরে। বিগত বাম সরকারের আমলে আমলাশোলে অনাহারে মৃত্যুর মতো ঘটনা ঘটেছিল। বর্তমানে জঙ্গলমহলে দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসকারী মানুষজনকে অনাহারে দিন কাটাতে হয় না। সেই সঙ্গে কেন্দুপাতার দাম আগের থেকে বহুগুণ বেড়ে গিয়েছে। নতুন নতুন আইটিআই কলেজ, সেই সঙ্গে পুলিশে কর্মসংস্থান হয়েছে জঙ্গলমহলের ছেলেমেয়েদের। শুধু পুলিশেই নয়, রাজ্য সরকারের বিভিন্ন দফতরের মাধ্যমে জঙ্গলমহলের ছেলেমেয়েদের চাকরি পাওয়ার ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী বারবার ছুটে গিয়েছেন জঙ্গলমহলে। লক্ষ্য একটাই, উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করা। তবুও এর মধ্যে রাজ্য সরকারের ভাবমূর্তি নষ্ট করার জন্য অতিবামপন্থী এবং বাম-বিজেপি তলায় তলায় একজোট হয়েছে। বিভিন্ন সময়ে ভারত-জাকাত মাঝিমাড়োয়াদের বনধ, অবরোধ সাধারণ মানুষকে অসুবিধার মধ্যে ঠেলে দিয়েছে, কখনও সাঁওতালি ভাষায় অলচিকি হরফে শিক্ষক নিয়োগ, কখনও-বা অন্যান্য দাবিকে সামনে রেখে। এই সংগঠনের নেতা নিত্যানন্দ হেমব্রম। তাঁর সঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী প্রথমে বিধানসভায় নিজের ঘরে, তার আগে নবান্নে বৈঠক করেছেন। সেই বৈঠকে নিত্যানন্দবাবু ছাড়াও জঙ্গলমহলের আদিবাসীদের প্রতিনিধিরা ছিলেন। উপস্থিত ছিলেন সেই সময় শিল্পী নচিকেতাও। আদিবাসী সাঁওতালদের জন্য মুখ্যমন্ত্রী বিভিন্ন প্রকল্প গ্রহণ করেছেন। তফসিলি জাতি-উপজাতির শংসাপত্র পেতে এখন আর এই সম্প্রদায়ের মানুষজনকে হত্যে দিয়ে পড়ে থাকতে হয় না। অনেক মুশকিল আসানের সম্ভব হয়েছে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাত ধরে। তিনি জঙ্গলমহলকে উজাড় করে দিয়েছেন, বিনিময়ে রাজ্য সরকারের ওপর মানুষ আস্থা রাখুক, এটাই তিনি চাইছেন। সে কারণে গতবার জঙ্গলমহলে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রী আহ্বান করেছিলেন, দয়া করে ভুল বুঝবেন না, আপনারা আমাদের ওপর বিশ্বাস রাখুন। সেই সঙ্গে দলীয় সভায় বার্তা দিয়েছিলেন, যাঁরা জঙ্গলমহলে ভুল বুঝে চলে গিয়েছেন, তাদেরকে ফিরিয়ে আনুন। তা না করলে আমি নিজে গিয়ে তাদের ফিরিয়ে আনব। মুখ্যমন্ত্রীর এই বার্তায় কাজ হয়েছে। তৃণমূল থেকে বসে যাওয়া নেতারা ঘরে ফিরেছেন। এতদিন উজাড় করে দিয়েছেন, এবার কিছু পাওয়ার পালা।

জঙ্গলমহলের মানুষ মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ওপর আস্থা রেখেই চলেছেন আগের মতো, এদিনের বৈঠক থেকে সেই বার্তাই মুখ্যমন্ত্রীকে দেওয়া হয়েছে বলে জানা যাচ্ছে। মুখ্যমন্ত্রী জনসংযোগ বৃদ্ধির ওপর বিধায়কদের জোর দেওয়ার কথা বলেছেন। বিধায়কদের নিজেদের বিধানসভায় কি করলে আরও ভালো পারফরমেন্স করা যায়, তার ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। পারফরমেন্স না করলে আগামী দিনে পদ খোয়াতে হতে পারে, এমনও বার্তা গিয়েছে বলে খবর। কারণ, বিধানসভায় ভালো ফল করে নিজে জয়ী হব, কিন্তু লোকসভায় গা-ছাড়া মনোভাব কোনও ভাবেই বরদাস্ত করবে না দল। ঐক্যবদ্ধভাবে সবাইকে ঝাপাতে হবে। যিনি লোকসভায় প্রার্থী হবেন তাঁকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রার্থী বলে মেনে নিয়ে প্রতি বুথে দলীয় প্রতীককে জয়যুক্ত করার কথাও বলা হয়েছে। বিভেদ ভুলে এক হয়ে কাজ করতে হবে। নতুন ভোটারদেরও কাছে টানার কথা বলা হয়েছে। বাম-বিজেপি সবাই তলায় তলায় একজোট হয়ে অপপ্রচার করতে পারে, সেই অপপ্রচার রোখার জন্য দলের সমস্ত শাখা সংগঠন এক হয়ে মাঠে নামতে হবে। কোথাও কারও গাফিলতি দল বরদাস্ত করবে না। মোদ্দা কথা একটাই, জিততেই হবে। কারণ, দীর্ঘ কয়েক দশক যে কাজ হয়নি তার চেয়ে অনেক কম সময়ে ঢের বেশি উন্নয়ন হয়েছে জঙ্গলমহলে। দল ভালো থাকলে নেতারাও ভালো থাকবেন। স্বাভাবিকভাবে ফাঁকফোকর দ্রুত মেরামত করে দলীয় প্রার্থীকে জয়ী করার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।

Spread the love

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।